কাজলা দিদি কবিতা – কাজলা দিদি কবিতাটি লিখেছেন কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচী। যতীন্দ্রমোহন বাগচীর রচিত কাজলা দিদি কবিতাটি “কাব্যমালঞ্চ” কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত। “কাব্যমালঞ্চ” কাব্যগ্রন্থের এক অন্যতম জনপ্রিয় কবিতা হল “কাজলা দিদি” কবিতা। যতীন্দ্রমোহন বাগচীর লেখা “কাব্যমালঞ্চ” কাব্যগ্রন্থটি ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়।

কবি ও সাংবাদিক যতীন্দ্রমোহন বাগচী। যিনি কাজলা দিদি লিখে সকল পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করেছেন। যতীন্দ্রমোহন বাগচী খুব অল্প বয়স থেকেই কাব্যচর্চা শুরু করেন। যতীন্দ্রমোহন ছিলেন রবীন্দ্রোত্তর যুগের শক্তিমান কবিদের অন্যতম। সেই যুগে রবীন্দ্রনাথের ভক্তের তুলনায় নিন্দুকের সংখ্যা ছিল অনেক বেশী। তখন যতীন্দ্রমোহনের মতো সাহসী তরুন বুদ্ধিজীবিরাই রবীন্দ্রনাথের জয়গান করে প্রকৃত আধুনিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। যতীন্দ্রমোহনের কবিতায় হাতে খড়ি তাঁর স্কুল জীবনে। তখন তিনি পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র।
কিশোর বয়সেই বই পড়ার প্রতি তার তুমুল আগ্রহ। বাড়িতে তো পড়েনই স্কুলের গ্রন্থাগারে বসেও্র আপন মনে বই পড়ছেন। ১৮৯১ সালে যতীন্দ্রমোহন শুনতে পেলেন ঈশ্বচন্দ্র বিদ্যাসাগর আর নাই। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মৃত্যুতে কবির কিশোর মন এই লেখকের মৃত্যুতে বেদনার্ত হয়ে ওঠে। নিজের মনকে শান্তনা দিতে লিখে ফেললেন বিদ্যাসাগর স্মরণে ছোট্ট একটা কবিতা। এ কবিতা শুনে অনেকেই বিস্মিত হয়ে যায়। অনেকের চোখ জলে ভরে ওঠে। এতটুকু ছেলে কি এক শোকের বাণী রচনা করে ফেলল। তেরো বছর বয়সে লেখা সেই রচনাটিই যতীন্দ্রমোহনের প্রথম মুদ্রিত কবিতা বলে জানা যায়।
এ থেকে তার লেখক জীবন শুরু। ছাত্রাবস্থা থেকেই ঠাকুর বাড়ির বিখ্যাত সাহিত্যপত্রিকা ‘ভারতী’ এবং সুরেশচন্দ্র সমাজপতি সম্পাদিত ‘সাহিত্য’ পত্রিকায় যতীন্দ্রমোহনের প্রথম যুগের কবিতা একের পর এক প্রকাশিত হতে থাকলে তিনি কবি হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। পল্লী প্রকৃতির সৌন্দর্য ও পল্লী জীবনের সুখ-দুঃখের কথা তিনি দক্ষতার সঙ্গে প্রকাশ করেন। কাজলদিদি ও অন্ধবন্ধু তাঁর দুটি বিখ্যাত কবিতা। ‘রবীন্দ্রনাথ ও যুগসাহিত্য’ তাঁর বিশেষ একটি গদ্য গ্রন্থ। ১৯৪৮ সালের ১লা ফেব্রুয়ারী তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কাজলা দিদির কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচীর ৬৬তম মৃত্যুদিনে তাঁর প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা।
কাজলা দিদি কবিতা – যতীন্দ্রমোহন বাগচী

বাঁশ-বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই,
মাগো আমার শোলক্-বলা কাজলা দিদি কই?
পুকুর ধারে লেবুর তলে,
থোকায় থোকায় জোনাক জ্বলে,
ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না, একলা জেগে রই,
মাগো আমার কোলের কাছে কাজলা দিদি কই?
সেদিন হতে কেন মা আর দিদিরে না ডাকো;
দিদির কথায় আঁচল দিয়ে মুখটি কেন ঢাকো?
খাবার খেতে আসি যখন
দিদি বলে ডাকি তখন,
ও-ঘর থেকে কেন মা আর দিদি আসে নাকো?
আমি ডাকি, তুমি কেন চুপটি করে থাকো?
বল্ মা দিদি কোথায় গেছে, আসবে আবার কবে?
কাল যে আমার নতুন ঘরে পুতুল বিয়ে হবে!
দিদির মত ফাঁকি দিয়ে
আমিও যদি লুকাই গিয়ে
তুমি তখন একলা ঘরে কেমন ক’রে রবে?
আমিও নাই—দিদিও নাই—কেমন মজা হবে!
ভূঁই-চাঁপাতে ভরে গেছে শিউলী গাছের তল,
মাড়াস্ নে মা পুকুর থেকে আনবি যখন জল |
ডালিম গাছের ফাঁকে ফাঁকে
বুলবুলিটা লুকিয়ে থাকে,
উড়িয়ে তুমি দিও না মা ছিঁড়তে গিয়ে ফল,
দিদি যখন শুনবে এসে বলবি কি মা বল্ |
বাঁশ-বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই,
এমন সময় মাগো আমার কাজলা দিদি কই?
লেবুর তলে পুকুর পাড়ে
ঝিঁঝিঁ ডাকে ঝোপে ঝাড়ে,
ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না, তাইতো জেগে রই,—
রাত্রি হোল মাগো, আমার কাজলা দিদি কই?
কাজলা দিদি কবিতার সারমর্মঃ
কাজলা দিদি কবিতায় তিনজন ব্যক্তির সম্পর্কে একটি ভালোবাসার অন্তর্নিহিত ছবি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এই কবিতার চরিত্রে দেখা গিয়েছে মৃত কাজলা দিদি এবং তার অবুজ ছোট্ট বোন, যে তার দিদিকে খুঁজে চলেছে। এছাড়াও দেখা গিয়েছে একজন সন্তানহারা মা, যার বুকে রয়েছে সন্তান হারানোর বেদনা এবং চাপা কান্না। কবিতায়, ছোট্ট বোনটি জানে না যে, তার কাজলা দিদি চিরদিনের জন্য তাদেরকে ছেড়ে চলে গেছে।
তাই সে প্রতি মুহুর্ত তার মায়ের কাছে জানতে চাই যে তার দিদি কোথায় গেছে এবং কেন আসতে এত দেরি হচ্ছে। কাজলা দিদি তাদের ছেড়ে চিরদিনের জন্য চলে গেছে, অর্থাৎ কাজলা দিদি মারা গিয়েছে। সে কথাটি জানতে পারলে ছোট্ট বোনটি আরও কষ্ট পাবে। তাই তার মা কোন উত্তর দিতে না পেরে মুখ লুকিয়ে চাপা স্বরে বসে বসে কাঁদেন।

