ভারতবর্ষ কি একটি জাতি, না বহুজাতির বাসভূমি?

ভারতবর্ষ কি একটি জাতি, না বহুজাতির বাসভূমি? প্রশ্নে সুনীতি কুমার ঘোষ তার “বাংলা বিভাজনের অর্থনীতি-রাজনীতি” গ্রন্থের “ভারতবর্ষ কি একটি জাতি, না বহুজাতির বাসভূমি?” প্রবন্ধে বলেন:

প্রথম প্রশ্ন, ভারতবর্ষ কি একটি জাতি, না বহুজাতির বাসভূমিঃ

ইতিহাস বলে অতীতে কখনো ভারতীয় জাতি বলে কোন জাতির অস্তিত্ব ছিল না; ভারতবর্ষ কখনো একটি দেশ ছিল না। তার দীর্ঘ ইতিহাসে মৌর্য, গুপ্ত ও মোগল সাম্রাজ্যের উদয় হয়েছে কিন্তু সেইসব সাম্রাজ্য সমগ্র ভারতবর্ষে বিস্তৃত ছিল না; এবং দীর্ঘকাল স্থায়ীও হয় নি। এক রাজবংশের পতনের সাথে সাথে এক একটি সাম্রাজ্য ধ্বসে পড়েছে। এইসব সাম্রাজ্যের মধ্যেও বিরাট বিরাট অঞ্চল সম্রাটের বশ্যতা স্বীকার করে পৃথক অস্তিত্ব ও শাসন বজায় রেখেছে।

ভারতবর্ষ কি একটি জাতি, না বহুজাতির বাসভূমি? - সুনীতি কুমার ঘোষ [ Suniti Kumar Ghosh ]
সুনীতি কুমার ঘোষ [ Suniti Kumar Ghosh ]
ভারতবর্ষের অধিবাসীদের কোন এক ভাষা ছিল না বা নেই—যে ভাষা তাদের এক জাতীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ করতে হতো। কার্ল মার্কস বলেছেন, ব্রিটিশ তরবারি ভারতের রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে দিয়েছে।’ তাও ‘ব্রিটিশ ভারত’ নামে বেশির ভাগ অংশ ইংরেজরা সরাসরি শাসন করতো। বাকি ভারত প্রায় ৫৬২টা ছোট বড় দেশীয় রাজ্যে বিভক্ত হয়ে ইংরেজের আজ্ঞাবহ দেশীয় রাজাদের দ্বারা শাসিত হতো। কোন যুগেই জনগণের মধ্যে সামগ্রিক ঐক্যবোধ ছিল না এবং এখনো নেই। জনতত্ত্ব (ethnically) এবং ভাষা ও সংস্কৃতির দিক থেকে পশ্চিম য়ুরোপের জাতিগুলির মধ্যে যে ব্যবধান আছে তার থেকেও বেশি ব্যবধান আছে একজন ওড়িয়া ও পাঞ্জাবীর মধ্যে, একজন তেলুগু ও রাজস্থানীর মধ্যে।

ব্রিটিশ শাসন শুরু হবার আগেই ভারতবর্ষে কতকগুলি জাতিসত্তা – তামিল, তেলুগু, বাঙালী, মারাঠি, গুজরাটী ইত্যাদি প্রত্যেকে তার নিজস্ব অঞ্চলে, নিজস্ব জনতত্ত্বগত (ethnic) বৈশিষ্ট্য, নিজস্ব ভাষা, নিজস্ব জীবনচর্যা, নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং ঐক্যবোধ নিয়ে গড়ে উঠেছিল। জাতিগঠনের যে ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া ভারতবর্ষে চলছিল তা ব্রিটিশ আমলে ব্যাহত হয়।

বিভিন্ন ভাষাভাষী অঞ্চলকে ব্রিটিশরাজের শাসন পরিচালনার স্বার্থে ও রাজনৈতিক প্রয়োজনে অন্য ভাষাভাষী অঞ্চলের সঙ্গে বা তার অংশের সঙ্গে অথবা কোনো দেশীয় রাজ্যের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। যেমন, তামিল এবং তেলুগু, কানাড়ী ও মালয়ালম ভাষী কম-বেশি অঞ্চল নিয়ে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি গঠিত হয়। আবার হায়দারাবাদ দেশীয় রাজ্যের মধ্যে ছিল তেলুগু-ভাষীদের একটা বড় অংশ এবং তার সাথে মারাঠি ও কানাড়িভাষী অঞ্চল। প্রত্যেক জাতিসত্তা বিভিন্ন প্রদেশ ও দেশীয় রাজ্যে বিভক্ত হয়ে যায়।

বাংলা থেকে বাংলাভাষী শ্রীহট্ট (সিলেট) ও অন্যান্য কিছু কিছু অঞ্চলকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। এক জাতিসত্তার মানুষদের মধ্যে যাতে জাতীয়তাবোধ না জন্মায় সেটাই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের নীতি ছিল। আমরা দেখবো এই উদ্দেশ্যেই ১৯০৫ সালে বাংলাকে ভাগ করা হয়েছিল।

 

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসনের সময়ে এবং তার প্রত্যক্ষ অবসানের পরে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদী শাসকশ্রেণীদের অত্যাচারের ফলে অনেক জাতিসত্তা যারা আগে সুপ্ত ছিল তারা আজ জেগে উঠেছে বা উঠছে। কাশ্মিরী জাতিসত্তার উন্মেষ দেখা যায় ব্রিটিশ শাসনের প্রত্যক্ষ অবসানের আগেই। সাম্রাজ্যবাদীদের পদলেহী ভারতীয় শাসকশ্রেণীদের সম্প্রসারণবাদী নীতি, আক্রমণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ বিভিন্ন নাগা কৌমগুলিকে (tribes) একটি ঐক্যবদ্ধ জাতিসত্তায় পরিণত করেছে। তেমনি মণিপুরী, মিজো প্রভৃতি জাতিসত্তা উত্তর-পূর্ব ভারতে দেখা দিয়েছে।

“নিখিল ভারতীয় জাতীয়তাবাদ’-এর তত্ত্ব ভারতের শাসকশ্রেণীদের স্বার্থে একান্ত প্রয়োজনীয়। ভারতের শাসকশ্রেণী চেয়েছে এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র (unitary state), তারা চেয়েছে একটি শক্তিশালী কেন্দ্র থেকে বিভিন্ন জাতিসত্তাকে শাসন, দমন ও শোষণ করতে।

১৯৫০ সালের জানুয়ারিতে ভারতের যে সংবিধান তারা গ্রহণ করে সে সংবিধান অনুযায়ী ভারতরাষ্ট্র আজ বিভিন্ন জাতিসত্তার কারাগার। এই সংবিধান রচনার সময়ে সাংবিধানিক উপদেষ্টারা (constitutional advisers) তাঁদের তৈরি খসড়া সংবিধানে ভারতরাষ্ট্রকে ‘ভারত যুক্তরাষ্ট্র (Federation of India) আখ্যা দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের সেই প্রস্তাব নাকচ হয়ে যায়। শাসকশ্রেণীর নির্দেশে সংবিধানে ‘ইণ্ডিয়া’র নাম হলো ভারত রাষ্ট্রসংঘ (Union of States’)। ‘ফেডারেশন। এর অর্থ রাজ্যগুলি স্বেচ্ছায় যুক্তরাষ্ট্রে যোগদান করছে এবং নির্দিষ্ট কিছু শাসনসংক্রান্ত বিষয় বা ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রীয় কেন্দ্রের হাতে অর্পণ করছে, বাকি সমস্ত বিষয় তাদেরই কর্তৃত্বে থাকবে। রাজ্যগুলির সমস্ত অধিকার সংবিধানে খর্ব করা হয়েছে।

 

সংবিধান রচনার সময়ে প্রস্তাব ছিল যে, রাজ্যের গভর্নর সেই রাজ্যের জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত হবেন। নেহরু কর্তৃক সে প্রস্তাব বাতিল হয়ে যায়। তার পরিবর্তে সংবিধান অনুযায়ী কেন্দ্র গভর্নর নিয়োগ করে এবং সেই গভর্নরের সুপারিশ অনুযায়ী কেন্দ্র রাজ্যের নির্বাচিত আইনসভা ও মন্ত্রিসভাকে বাতিল করে দিতে পারে। শুধু গভর্নর নয়, বিভিন্ন রাজ্যের শাসনবিভাগে, বিচারবিভাগে এবং পুলিশবিভাগে উচ্চতম পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিরা কেন্দ্র কর্তৃক নিযুক্ত হন এবং তাঁরা কেন্দ্রের কাছেই জবাবদিহি করতে বাধ্য। সামরিক বাহিনী, আধা-সামরিক বাহিনী কেন্দ্রেরই শাসনাধীনে। বিভিন্ন রাজ্যের অর্থনৈতিক জীবনকেও পরিপূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার কেন্দ্রের আছে। কেন্দ্র রাজ্যের সীমানা পর্যন্ত পরিবর্তন করতে পারে। আমরা এই সংবিধানের বিস্তৃত আলোচনায় যাবো না।

( সমস্ত ভারতীয়রা এক জাতি এই তত্ত্বের সমর্থনে যুক্তি দেওয়া হয় যে তাঁদের একই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। রুশ লেখক ডায়াকোভ সঠিকভাবে মন্তব্য করেছিলেন যে, the common cultural fund that has developed in India “is no greater than the common cultural fund of the different peoples of Europe, of the Far East and of the Middle East” অর্থাৎ, ভারতের জনগণের যে একই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আছে য়ুরোপের অথবা দূরপ্রাচ্যের বা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন জাতিদের যে সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার তার থেকে বেশি নয়। একজন রাজস্থানীর সংস্কৃতি ও একজন বাঙালীর সংস্কৃতি, এ দুয়ে কিছু মিল থাকতে পারে কিন্তু অমিলটাই প্রধান। একজন ইংরেজ ও একজন জার্মান বা ওলন্দাজের মধ্যে সাংস্কৃতিক মিল এর থেকে বোধহয় বেশি।

ভারতের সংবিধানে দেবনাগরী লিপিসহ হিন্দিকে যখন সমস্ত ভারতীয় জাতিসত্তার উপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয় তখন সংবিধান সভায় কংগ্রেসেরই দীর্ঘকাল কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য, মহারাষ্ট্রের নেতা, শঙ্কররাও দেও বলেছিলেন: “…আর এস এস (রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ]-এর সর্বোচ্চ নেতা সংস্কৃতির নামে আবেদন করেন, কিছু কংগ্রেসীরাও সংস্কৃতির নামে আবেদন করেন। কেউ বলেন না যে এই ‘সংস্কৃতি’ শব্দটার অর্থ কি। আজ যেভাবে এর ব্যাখ্যা করা হচ্ছে এবং বোঝা যাচ্ছে এর একমাত্র অর্থ হচ্ছে বহুর উপর মুষ্টিমেয়ের আধিপত্য”। ২ ডায়াকোভও বলেছিলেন, “এক জাতি-তত্ত্ব” (“one nation concept) ভারতীয় বুর্জোয়াশ্রেণীর শীর্ষস্থানীয়দের প্রধানত গুজরাট ও মাড়োয়ারের পুঁজিপতিদের, কেন্দ্রমুখীনতার প্রকাশ। এই পুঁজিপতি গোষ্ঠী ভারতের বাজারের উপর আধিপত্য করার একচেটিয়া অধিকার চায়।”৩

 

ভারতের শাসকশ্রেণী ও তার রাজনৈতিক প্রতিনিধিরাও জানতেন যে ভারতীয়রা ‘এক জাতি’ নন। তাঁরা স্বীকার করে গেছেন যে, ভারতীয় জাতির অস্তিত্বই নেই; তাঁদের মতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ভারতের জনগণের মিলিত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যদি এমন কোন জাতি জন্ম নিয়ে থাকে তবে তার সবে অঙ্কুরোদগম হয়েছে। পুরানো বিভিন্ন জাতিসত্তাগুলিকে নির্মূল অথবা খর্ব করে এই ক্ষুদ্র চারাটির গোড়ায় জলসেচন ইত্যাদি করে একে ক্রমশ মহীরূহে পরিণত করতে হবে, এই দায়িত্ব নিয়েছিলেন তাঁরা।

 

নিখিল ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ধ্বজা যিনি সবচেয়ে উচ্চে তুলে ধরেছিলেন সেই পণ্ডিত জহরলাল নেহরু ১০ মে ১৯৫৬তে বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের কাছে চিঠিতে লিখেছিলেন যে, “মৌলিক সত্য হচ্ছে আমাদের এখনও ঐক্যবদ্ধ জাতি গড়ে তোলা বাকি আছে। আমরা দেখবো, হিন্দু ও পার্শি বড় বুর্জোয়ার ও অন্যান্য সুবিধাভোগী শ্রেণীর প্রতিনিধি কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব যেমন নিখিল ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ধ্বজা ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছিল তেমনি তার পাল্টা মুসলিম বড় বুর্জোয়া ও অন্যান্য সুবিধাভোগী শ্রেণীর প্রতিনিধি মুসলিম লীগ ১৯৪০ সাল থেকে ‘নিখিল ভারতীয় মুসলিম জাতীয়তাবাদে’র ধ্বজা ওড়ালো। এই দুই জাতীয়তাবাদই সম্পূর্ণ ভুয়ো এবং এই দুই জাতীয়তাবাদের লড়াইয়ে যে গরল উঠলো তার ফলে ভারত ভাগ হলো, বাঙলা ও পাঞ্জাব ভাগ হলো।

বিশিষ্ট সাংবাদিক ও লেখক ফ্র্যাঙ্ক মোরেস বলেছিলেন: “ভারতবর্ষের ঐক্য যদি কৃত্রিম ছিল তো ভারতবর্ষের বিভাগও তাই। ভারতবর্ষ যদি বিভক্তই হতে হয় তবে জনতত্ত্বগত (ethnic) এবং সাংস্কৃতিক সংহতি ও ভাষার ভিত্তিতে যুক্তিসম্মতভাবে ভাগ হওয়া উচিৎ ছিল।”৬ বাংলা তথা ভারতবর্ষ কেন কৃত্রিমভাবে ভাগ হলো সেই প্রশ্নের উত্তর আমরা এই গ্রন্থে সন্ধান করবো। তবে তার আগে আমরা বাংলা ও বাঙালীজাতি সম্বন্ধে সংক্ষেপে কিছু আলোচনা করবো।

মন্তব্য করা বন্ধ রয়েছে।