মুক্তিযুদ্ধে আকবর বাহিনী – মামুন রশীদ

মুক্তিযুদ্ধে আকবর বাহিনী [ মামুন রশীদ ] : ১৯৪৭ সালে দেশভাগের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় ভারত ও পাকিস্তান নামের দুটি রাষ্ট্র। পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তান নামের পৃথক দুই ভূখণ্ডের সমন্বয়ে গঠিত পাকিস্তানে প্রথম থেকেই বৈষম্য আর শোষণ ও বিমাতাসুলভ আচরণের শিকার পূর্ব পাকিস্তান এবং পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ। পলাশির আম্রকাননে বাংলার যে স্বাধীনতার সূর্য ডুবে গিয়েছিল, পাকিস্তানিদের ২৪ বছরের শোষণ সেই স্বাধীনতার সূর্যকে ফিরিয়ে আনার প্রত্যয় দৃঢ় করে বাঙালির মনে।

মুক্তিযুদ্ধে আকবর বাহিনীর কমান্ডার আকবর হোসেন [ Akbar Hossain, the commander of Akbar Forces ]
মুক্তিযুদ্ধে আকবর বাহিনীর কমান্ডার আকবর হোসেন [ Akbar Hossain, the commander of Akbar Forces ]
মুক্তি, স্বায়ত্তশাসন আর স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রামে ১৯৪৮, ১৯৫২, ১৯৬২, ১৯৬৬, ১৯৬৯ এবং সবশেষে ১৯৭০-এর নির্বাচন সেই ধারাবাহিকতায় আমাদের এগিয়ে দিয়েছে চূড়ান্ত লক্ষ্যের দিকে। বাঙালিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা, ১৯৭১-এর ২ মার্চ ছাত্রলীগের স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন, ৭ মার্চ রেসকোর্সে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ঘোষণা, ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানিদের বর্বরোচিত হামলা এবং ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ একটি নির্দিষ্ট সীমারেখায় স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে নিজেকে তুলে ধরে।

মুক্তিযুদ্ধে আকবর বাহিনী

দেশকে শত্রুমুক্ত করা এবং সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল গঠিত হয় মুজিবনগর সরকার। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দিন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করে গঠিত হয় ৫ সদস্যের মন্ত্রিসভা। ঘোষিত হয় স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার-এর মন্ত্রিপরিষদ ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ শপথ গ্রহণ করে। মুজিবনগর সরকার গঠিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ সরকার যুদ্ধ পরিচালনার বিষয়টিকে গুরুত্ব প্রদান করে। নির্দেশনা প্রদান করা হয় মুক্তিবাহিনী সংগঠনের।

ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল এমএজি ওসমানীকে মুক্তিবাহিনীর জেওসি ইন চিফ (জেনারেল অফিসার কমান্ডিং) নিয়োগ দেয়া হয়। সেদিনের ঘোষিত আনুষ্ঠানিক মুক্তিবাহিনীর বাইরেও বাংলাদেশের ভূখণ্ডের ভেতরে গড়ে উঠেছিল অনেকগুলো গেরিলাবাহিনী। এই বাহিনীগুলো মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ সরকারের নিয়মিত বাহিনীর মতোই পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করে। সারা দেশের ভেতরে অনেকগুলো মুক্তাঞ্চল প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয়।

নিয়মিত বাহিনীর বাইরে গড়ে ওঠা এই বাহিনীগুলোর অন্যতম ছিল ‘আকবর বাহিনী’। ‘বৃহত্তর যশোর জেলার উত্তরে বর্ডার থেকে ১০০ মাইল অভ্যন্তরে গড়াই নদীর গা ঘেঁষে শ্রীপুর থানা অবস্থিত। যা বর্তমানে মাগুরা জেলাধীন, স্বভাবতই বৃহত্তর যশোর ৮ নং সেক্টরে পড়েছিল। আর এই শ্রীপুর থানাতেই গড়ে উঠেছিল ‘আকবর বাহিনী’।

এই বাহিনীর বীরত্বগাঁথা সেদিন মানুষের মুখে মুখে, ওপার বাংলার পত্র-পত্রিকায় সবার শীর্ষে স্থান পেয়েছিল। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে আকবর বাহিনীর বীরত্বগাঁথা ও রণাঙ্গনে বিজয়ের খবর নিয়মিত প্রচার হতো। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র সেদিন স্বগর্বে ঘোষণা করেছিল, ‘শ্রীপুর মুক্ত অঞ্চল।” বৃহত্তর যশোরের বর্তমান মাগুরা জেলার শ্রীপুর থানায় গড়ে ওঠা এই বাহিনী পরবর্তীকালে ‘শ্রীপুর বাহিনী’ নামে পরিচিতি পায়।

আকবর হোসেন

আকবর হোসেনের জন্ম ব্রিটিশ শাসনামলে কুমার নদীর তীরঘেঁষা টুপিপাড়া গ্রামে। বাবা মিয়া গোলাম কাদের। ধর্মপরায়ণ পরিবারে বেড়ে ওঠা আকবর হোসেনের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়েছিল গ্রামের মক্তবে। মক্তবের পাঠ শেষ করে তিনি ভর্তি হন শ্রীপুর হাই স্কুলে। হাই স্কুলে পড়ার সময়েই আসে ১৯৪৭ সাল। ভারতবর্ষ ভাগ হয়ে দুটি নতুন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় প্রত্যক্ষ করেন আকবর হোসেন।

স্বাধীনতার আনন্দে সহপাঠীদের সঙ্গে সাজিয়ে তোলেন শ্রীপুর থানা ভবন। কৈশোরের রঙিন স্বপ্নে উড়ান পাকিস্তানের পতাকা। তৎকালীন পাকিস্তানের পূর্ব পাকিস্তান অংশের অন্য বাঙালিদের মতোই তিনিও এই আনন্দ বেশিদিন উপভোগ করতে পারেননি। যে স্বপ্নে কণ্ঠে তুলেছিলেন, ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান। ছিনকে লেঙ্গে পাকিস্তান’ সেই স্বপ্ন ভঙ্গ হতে দেরি হয়নি। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে উত্তাল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সবার মতোই তিনিও আন্দোলিত হয়েছিলেন।

ন্যাশনাল গার্ডের সালারে গোরো আকবর হোসেন ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে শ্রীপুরের স্কুলগুলোতে পালিত ধর্মঘটে অংশ নেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ে কিশোর আকবর হোসেন আকাশে ব্রিটিশ যুদ্ধবিমানের ঝাঁক বেঁধে উড়ে যাওয়া দেখে স্বপ্ন দেখতেন বৈমানিক হবার। সেই ইচ্ছে পূরণ করতে ১৯৫১ সালে যোগ দেন পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে। বিমানসেনা হিসেবে প্রশিক্ষণ নেন পশ্চিম পাকিস্তানের সীমান্ত ঘেঁষা জেলা শহর কোহাটে।

সব ক্ষেত্রেই বাঙালির ওপর শোষণ, নির্যাতনের স্টিম রোলার চালানো পাকিস্তানিদের অত্যাচার ছিল বিমানবাহিনীতেও। এখানেও পূর্ব পাকিস্তানিদের দেখা হতো অবজ্ঞার চোখে। চলত অশ্রাব্য গালিগালাজ। সব দেখে শুনে মন বিষিয়ে ওঠে আকবর হোসেনের। সিদ্ধান্ত নেন, আর না, ফলে ১৯৫৪ সালে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে ফিরে আসেন দেশের মাটিতে।

রাজনৈতিক জীবন

১৯৫৪ সালে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানে নিজের বাড়িতে ফিরে আসার পর আকবর হোসেন প্রত্যক্ষ করেন যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন। এই নির্বাচন হক-ভাসানী সোহরাওয়ার্দীর ২১ দফার পক্ষে জন রায় দেয়। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর আকর্ষণে আকবর হোসেন আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। দলের প্রতি ভালোবাসা এবং আনুগত্যে আকবর হোসেন নিজের এলাকায় সর্বশক্তি দিয়ে আওয়ামী লীগের প্রতি মানুষের সমর্থন আদায়ের জন্য কাজ করতে থাকেন।

আকবর হোসেন সাংগঠনিক প্রচেষ্টায় অনেকেই যোগ দেয় আওয়ামী লীগে। সাংগঠনিক দক্ষতায় তিনি শ্রীপুর থানা আওয়ামী লীগের সম্পাদক পদ লাভ করেন। পরবর্তীকালে মাগুরা মহকুমা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৬৫ সালে ইউনিয়ন কাউন্সিল নির্বাচনে শ্রীপুর থানার আটটি ইউনিয়নের মধ্যে একমাত্র তিনিই আওয়ামী লীগ প্রার্থী হিসেবে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

মুক্তিযুদ্ধে প্রথম পর্যায়ের প্রতিরোধে ভূমিকা:

নানা ঘটনা এবং ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭০ সালের নির্বাচন। নির্বাচনে জয়ী দল আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করে পাকিস্তানিরা। পরিবেশ বিবেচনায় এনে বঙ্গবন্ধু ১৯৭১-এর ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রামের স্বাধীনতার সংগ্রাম। একই সঙ্গে তিনি ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলারও নির্দেশ দিয়ে যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করার কথা ঘোষণা করেন। এগিয়ে আসে বাঙালির জীবনের কালোরাত্রি ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ।

পাকিস্তানি সেনাবাহিনী রাতের আঁধারে নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ডে মেতে ওঠে। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতার হবার পূর্ব মুহুর্তে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণায় চলমান আন্দোলনকে সামনে এগিয়ে নেবার প্রত্যয়ে প্রতিরোধযুদ্ধে অংশ নেয় সাধারণ মানুষ। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে গ্রাম-গঞ্জের মানুষ ঢাল, তলোয়ার, সড়কি, লাঠি, বন্দুক প্রভৃতি নিয়ে অপ্রতিহত গতিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়।

মুক্তিযুদ্ধে আকবর বাহিনীর কমান্ডার আকবর হোসেন [ Akbar Hossain, the commander of Akbar Forces ]
মুক্তিযুদ্ধে আকবর বাহিনীর কমান্ডার আকবর হোসেন [ Akbar Hossain, the commander of Akbar Forces ]
মাগুরাতেও গড়ে ওঠে দুর্ভেদ্য প্রতিরোধ। প্রতিরোধের এই পর্বে মাগুরার এমএনএ জনাব সোহরাব হোসেন অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এ সময় মাগুরা আনসার ক্যাম্পে, শাহাদত আলী, সুধীর কুমার, শহিদ মুকুল, জোকার আলাউদ্দিন, আবুবকর, আবুল হোসেন মিয়া, খন্দাকার আবু হাসান, সিরাজুল ইসলাম, নাছির এবং আরো অনেকের’র সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প খোলেন আকবর হোসেন। মুক্তিসেনাদের অধিকাংশই ছিল শ্রীপুর থানার শ্রীপুর কলেজের ছাত্র।

ট্রেনিং ইনস্ট্রাক্টর পুলিশ হাবিলদার শাহজাহান, শহিদ হাছোর রশীদ ও আব্দুল মান্নানের ট্রেনিং পরিচালনায় শুরু হয় মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং। ক্যাম্পের সার্বিক পরিচালনার দায়িত্ব নেন আকবর হোসেন। এ সময় আধুনিক কোনো অস্ত্রশস্ত্র না থাকলেও শুধুমাত্র আত্মবিশ্বাস, দেশপ্রেম এবং সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাসের উপর ভর করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

মাগুরা মহকুমার ট্রেজারিতে এ সময় যে অস্ত্র ছিল তা হাবিলদার শাহজাহানের নেতৃত্বে পুলিশ, ছাত্রজনতা মিলে কেড়ে নেয়। যার মাধ্যমে মাগুরার চারপাশের সীমাখালি, আলমখালি, বিষয়খালি, কামারখালি, লেবুতলা, লাঙ্গলবাঁধসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয় মুক্তিপাগল মানুষ। অল্প দিনের মধ্যেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ শুরু হয়।

কুষ্টিয়ায় মুক্তিসেনাদের (ইপিআর) সঙ্গে পাকিস্তানিদের তুমুল যুদ্ধে পাকিস্তানিরা পরাজিত হয়ে পালিয়ে যাবার সময় ঝিনাইদয়ে লৌহজঙ্গা গ্রামে ঢুকে পড়লে তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক ওয়ালিউল ইসলামের নেতৃত্বে হাজার হাজার মানুষ তাদের ঘেরাও করে গুলি করে হত্যা করে। এখানে পাকিস্তানিদের গুলিতে বেশ কয়েকজন নিহত হলেও মানুষ রাইফেলের সামনে সেদিন ঢাল, সড়কি নিয়েই দাঁড়িয়ে যায়। সারা দেশে পাকিস্তানিদের হত্যা, নির্যাতনের মাত্রা বাড়তে থাকে।

দলে দলে মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামমুখী হয়। এইসব মানুষদের মুখে পাকিস্তানিদের কর্মকাণ্ড, তাদের নির্যাতনের কথা শুনে আকবর হোসেন মর্মাহত হন। তিনি এসময় অসহায় মানুষদের সাহায্যের জন্য অনেকের সঙ্গে মিলে কামারপাড়ায় একটি সাহায্যশিবির খোলেন। সঙ্গে কাজলী, সচিলাচর বাজারেও গড়ে ওঠে সাহায্য শিবির ও ট্রেনিং সেন্টার। এ সময় সেনাবাহিনীর কয়েকজন বাঙালি জওয়ানের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় আকবর হোসেনের।

তাদের কাছে চট্টগ্রামে পাকিস্তানিদের অত্যাচারের কথা শুনে বিস্মিত হন তিনি। ইতোমধ্যে পাকিস্তানিরা শহর-বন্দর আয়ত্তে আনার জন্য তাদের তৎপরতা জোরদার করে। অথচ মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে হতাশা, তাদেরকে নেতৃত্ব দেবার মতো, সংগঠিত করার মতো প্রাথমিক পর্যায়ে কেউ পাশে নেই। এ অবস্থায় নিজের কর্তব্য স্থির করেন আকবর হোসেন। এ প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, ‘মাগুরা থেকে আট মাইল উত্তরে আমার বাড়ি।

বিশেষ কাজে একদিন বাড়ি এসেছি। হঠাৎ জানতে পারলাম এমএনএ সোহরাব হোসেন সাহেব, এমপিএ আছাদুজ্জামান সাহেব, মহকুমা প্রশাসক ওয়ালিউল ইসলাম সাহেব ও আরো কতিপয় নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি পরিস্থিতি বিশেষ ভালো নয় দেখে ব্যাংকের টাকা-পয়সা উঠিয়ে নিয়ে ভারতে পাড়ি জমিয়েছেন। অতি প্রত্যুষে দ্রুত ক্যাম্পে পৌঁছে দেখি সব কিছুই এলোমেলো আর কোথাও কিছু নেই। খাদ্যসামগ্রীর গোডাউনগুলো লুটপাটের ফলে অন্তসারশূন্য অবস্থায় পড়ে আছে। প্রচুর শুকনো ত্রুটি পড়ে আছে।

মুক্তিযুদ্ধে আকবর বাহিনীর কমান্ডার আকবর হোসেন [ Akbar Hossain, the commander of Akbar Forces ]
মুক্তিযুদ্ধে আকবর বাহিনীর কমান্ডার আকবর হোসেন [ Akbar Hossain, the commander of Akbar Forces ]
ব্যাংক ট্রেজারি সব লাল বাতি জ্বেলে দিয়েছে। কেরোসিন, পেট্রোল প্রভৃতি বিক্রি করে স্বার্থান্বেষী ব্যক্তিরা যে যা পারছে আত্মসাৎ করছে। এমনতরো পরিস্থিতিতে সে মুহূর্তে আমার মনে হলো, মাগুরা শহর শূন্য এবং একটা থমথমে ভাব বিরাজ করছে। দেখলাম কয়েকজন মুক্তিসেনা আনসার ক্যাম্পে বসে আছে। তাদের খাওয়া-দাওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। এমনকি সন্ধ্যায় বাতি জ্বালাবার মতো সামান্য তেলও অবশিষ্ট নেই।

ইতোমধ্যেই নেতা ভাইদের সাথে হবু নেতারাও পাড়ি জমিয়েছেন। খোঁজখবর নিয়ে মাগুরার তৈয়ব ভাই, আব্দুল জলিল সর্দার, মুন্সী নূরুল ইসলাম, আফসার মৃধা, আবুল খায়ের ও ফাত্তাহকে ডাকালাম। উদ্দেশ্য যে ভাবেই হোক ক্যাম্প চালিয়ে যেতে হবে। এ নিয়ে অনেক আলোচনা সমালোচনা এমনকি বাক-বিতণ্ডাও হলো অনেক। কিন্তু কোনো সুরাহা হলো না।

বন্ধুরা সবাই একে একে চলে গেলেন। কিন্তু আমি হাল ছাড়লাম না। আমার কাছে মাত্র পাঁচশত টাকা ছিল, আপাতত তা দিয়েই ক্যাম্প চালু করে দিলাম। মুক্তিসেনাদের থাকা খাওয়া এবং রীতিমতো প্রশিক্ষণ দানের ব্যবস্থা করে ফেললাম। এ সময়ে কয়েকটি হৃদয়বিদারক ও দুঃখজনক ঘটনার সূত্রপাত হয়।

বেঙ্গল রেজিমেন্টের সিপাই সদ্য আগত সুরুজ মিয়ার নেতৃত্বে একদল আনসার কামারখালি ঘাটে ডিউটির নাম করে লুটপাট শুরু করে ও নিজেদের আয়ত্তে আনে। অপর একদল আনসার আমার বিনা অনুমতিতে অস্ত্রে শস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বিকালে আনসার ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে যায়। উপায়ন্তর না দেখে মডেল স্কুলে অবস্থানরত ইপিআরদের নিকট সঙ্গে সঙ্গে খবর পাঠিয়ে দেই। তারা অনতিবিলম্বে বেরিয়ে যাওয়া আনসারদের ক্যাম্পে প্রত্যাবর্তন করতে বাধ্য করে।

অবস্থা ক্রমান্বয়েই আয়ত্তের বাইরে চলে যেতে লাগল। এর মধ্যে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। সহসা আকাশ জুড়ে কালো মেঘ ঘনিয়ে এলো। ভীষণ ঝড়-বৃষ্টি হতে ঘোর অন্ধকারের মধ্যে জীবনের আশঙ্কা অনুভব করে শ্রীপুরের জোয়ার্দার আব্দুল রহিম, বরিশালের মোল্লা নবুয়ত আলী, জাকির হোসেন, কাজলীর মোল্লা মতিয়র রহমান ও নূরুল ইসলামসহ রাতের অন্ধকারে মাগুরা ক্যাম্প ত্যাগ করতে বাধ্য হই। তখন আমাদের সঙ্গে ছিল মাত্র ৬টা রাইফেল আর বাড়িতে ছিল একটা চাইনিজ রাইফেল ও কয়েক রাউন্ড গুলি।

আনসার ক্যাম্পের রাইফেল ও এলএমজি আনার জন্য চেষ্টা চালিয়েও আনতে পারিনি। কারণ তখন পূর্বোক্ত বিদ্রোহী দল সবল হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক কৌশলে শুধুমাত্র একটি অয়ারলেস সেট নিয়ে কোনমতে শ্রীপুর পৌছি।

মুক্তিযুদ্ধে আকবর বাহিনীর কমান্ডার আকবর হোসেন [ Akbar Hossain, the commander of Akbar Forces ]
মুক্তিযুদ্ধে আকবর বাহিনীর কমান্ডার আকবর হোসেন [ Akbar Hossain, the commander of Akbar Forces ]
১৯৭১ এর ২৫ মার্চের পরেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সারা দেশে যে তাণ্ডবলীলা শুরু করে তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে উঠতে থাকে। পাকিস্তানিরা নির্বিচারে মানুষ হত্যা, বাড়িঘর লুট, অগ্নিসংযোগ করতে থাকে। এ সময় তারা ঘোষণা দেয়, ‘সব লুট কর লেও, কাফের খাম কর দো, মালাউনকা গর্দান লে লো”। বিভিন্ন স্থানে তারা মাইকে প্রচার করতে থাকে, ‘শহর সে সব লুট কর লও।’

পাকিস্তানিদের পক্ষ থেকে এ ধরনের ঘোষণা এবং নির্দেশের ফলে সারা দেশে লুটপাটের মহোৎসব শুরু হয়ে যায়। পাকিস্তানিদের সহায়তায় রাজাকার-আল বদর আল শামস বাহিনীর বিপুল উৎসাহে লুটতরাজ শুরু করে, শুরু করে গণহত্যা। এদের সঙ্গে সঙ্গে অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদেরও অনেকে ভোল পাল্টে যোগ দেয় এই লুটতরাজে। চুরি-ডাকাতির হিড়িক পড়ে যায় এ সময়। মাগুরাতেও এই ঢেউ লাগে।

কুখ্যাত ডাকাত রব্বানী, জয়নাল, কাওছার, নান্নু, লাল, বারিক, মজিদ, মকবুল, রাজ্জাক, রুস্তম, ইমান আলী, হামেদ, মকা প্রভৃতি দস্যুদের অত্যাচার পাকিস্তানিদের অত্যাচারকেও ছাড়িয়ে যেতে থাকে। এমনকি সহায়-সর্বস্ব হারিয়ে প্রাণের মায়ায় ভারতে আশ্রয় নেবার জন্য যাওয়া শরণার্থীদের ওপরও লুটপাট চলতে থাকে। শ্রীপুর থানার এ সময়ের দারোগা মতিয়ার রহমানও এই সুযোগে যাত্রীদের টাকা, পয়সা, সোনাদানা ছিনিয়ে নেয়ার কাজে লেগে পড়ে।

চুরি-ডাকাতি, লুটপাটের এসব ঘটনায় এলাকার চেয়ারম্যান এবং আকবর বাহিনীর প্রধান হিসেবে আকবর হোসেন মানুষকে নিরাপত্তা দেয়া এবং পাকিস্তানিদের পাশাপাশি এসব দস্যুদেরও খতম করার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। এ সময়ে তার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন- মোল্লা নবুয়ত আলী, শাহাবুদ্দিন খান, মৌলভী খন্দকার নাজায়েত আলী, আবু হাসান, সুবেদার ওহাব, লতিফ, সুলতান, শহিদুল ইসলাম, আনারউদ্দিন, মকতাদ, মকসেদ প্রমুখ।

মূলত পুরো মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়েই আকবর বাহিনীকে পাকিস্তানি হানাদারদের সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় এবং আঞ্চলিক দস্যু ও ডাকাতদলের মোকাবেলা করতে হয়েছে। দ্বিমুখী শত্রুর হাত থেকে দেশকে রক্ষার দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে।

আকবর বাহিনীর স্বীকৃতি:

আকবর বাহিনী গঠনের পর থেকেই বাহিনীর প্রধান আকবর হোসেন তার বাহিনীকে স্থায়ী করার জন্য চেষ্টা চালাতে থাকেন। আর এই লক্ষ্যে তিনি ১৯৭১ সালের জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে এই বাহিনীর ১২৮ জনের নামধামসহ রাইফেলের নম্বর ও গোলাবারুদের পরিমাণ মুক্তিবাহিনীর সেক্টর কমান্ডারের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।

তার পাঠানো মুক্তিযোদ্ধাদের নামতালিকা পাবার পর মুজিবনগর সরকারের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ ৮-৯ নং সেক্টরের কমান্ডার মেজর আবুল মঞ্জুর পিএসসিকে নির্দেশ দেন আকবর বাহিনীকে মঞ্জুরি দেবার জন্য। ৩১ অক্টোবর, ১৯৭১ তারিখে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আকবর বাহিনীর প্রধান আকবর হোসেনের কাছে একটি সনদপত্র তুলে দেয়া হয়।

সনদপত্রে বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চল নিয়ে গঠিত ৮ ও ৯ নং সেক্টরের অধিনায়ক মেজর আবুল মঞ্জুর লেখেন, ‘জনাব আকবর হোসেন মিয়া, পিতা- গোলাম কাদের মিয়া, গ্রাম: টুপিপাড়া, থানা: শ্রীপুর, জেলা: যশোহার, আপনার ও আপনার বাহিনীর উদ্যম, উৎসাহ ও বীরোচিত কার্যকলাপের পরিচয় পেয়ে আমি সানন্দে আপনার বাহিনীকে বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর অনুমোদিত শাখা বলে সনদ দান করলাম।

আজ থেকে মুক্তিবাহিনীর রেকর্ডে ও অত্র এলাকায় আপনার বাহিনী ‘শ্রীপুর বাহিনী’ নামে পরিচিত হবে। আপনাকে উক্ত বাহিনীর অধিনায়কের পদে প্রতিষ্ঠিত করা হলো। আপনি ও আপনার বাহিনী প্রতিটি মুক্তিসংগ্রামীর সাথে সহযোগিতা করবেন, মুক্তিবাহিনীর হাই কমান্ডের পক্ষ থেকে আমার দ্বারা যে সকল কমান্ডার নিযুক্ত হবেন তাদের সাথে একযোগে আপনারা কাজ করবেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, [ Bangladesh Liberation War ]
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, [ Bangladesh Liberation War ]
৮ ও ৯ নং সেক্টরের অধিনায়কের কাছ থেকে সনদ পাবার কিছুদিনের মধ্যেই ২৭.১০.১৯৭১-এ মেজর এম এন হুদা আকবর বাহিনীর প্রধান আকবর হোসেনের কাছে ৩০৩ রাইফেলের ২৫০০ গুলি, এসএলআর-এর ৩৫০ রাউন্ড গুলি, ৪টি মাইন এস ১৬, ৪টি এটিকে এবং ২টি বুকলেটসহ ইংরেজিতে একটি চিঠি লেখেন। (চিঠিটি বাংলায় অনুবাদ করে দেয়া হয় আকবর হোসেনের মুক্তিযুদ্ধে আমি ও আমার বাহিনী বইয়ে)।

চিঠিতে মেজর এম এন হুদা লিখেছিলেন, ‘মি. আকবর, আপনাকে লিখতে পেরে আমি যারপরনাই আনন্দিত। কারণ, আপনার দুঃসাহসিক বীরত্বে, যে আঞ্চলিক বাহিনী সংগঠিত করেছেন এবং আমাদরে উভয়েরই চির শত্রুর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত থাকায় আপনাকে উষ্ণ অভিনন্দন। আপনার গোলা-বারুদের চাহিদার কথা যথাসময়ে পেয়েছি। মেজর মঞ্জুর এবং আমি উভয়েই অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে নিয়েছি। ইনশাআল্লাহ অতি সত্তর আপনি আপনার চাহিদা ছাড়াও অধিক পাইবেন।

গোপনীয়তার কারণে উপস্থিত এর চাইতে বেশি কিছু বলতে পারছি না। ইতোমধ্যে কিছু জরুরি প্রয়োজন মেটানোর মতো গোলা-বারুদ ও মাইন পাঠাচ্ছি। যাতে বিশেষ করে আমাদের ছেলেরা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে। আমাদের ছেলেরা যে প্রতিরোধ সৃষ্টি করেছে তাদের সবাইকে মোবারকবাদ জানাই। মেহেরবানী করে এর আগে যতোগুলি প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়েছে তার বিস্তারিত প্রতিবেদন পাঠাবেন। মেহেরবানী করে খেয়াল রাখবেন, যে সমস্ত ঘটনার বিবরণ আমার কাছে পাঠানো হয়, তা যেন বিশ্বাসযোগ্য হয়।

বিশেষ করে শত্রু সৈন্য হতাহতের ব্যাপারে। গণবাহিনীতে যে সব ছেলেদের পাঠানো হয়েছে তারা খুবই তরুণ ও পরিপক নয়। তাদেরকে কোনো বড় ধরনের তৎপরতায় সম্পৃক্ত করা উচিত নয়, আমাদের মুক্তিফৌজ হিসেবে সুনামের উপর খুবই মন্দ প্রভাব ফেলবে। এ ব্যাপারে আপনি বিশেষভাবে বোঝাবেন যে, তারা যেন অপারেশনের মিলিটারির ওপর নজর রাখে। বেসামরিক ব্যাপারে তাদের সম্পৃক্ত করবে না।

আমাদের ছেলেরা যেন মিলিটারি অপারেশনের ব্যাপারে ক্ষিপ্রগতি সম্পন্ন হয়। আক্রমণ করে এবং বুদ্ধি প্রয়োগের মাধ্যমে শত্রুদের নাজেহাল করে। তারা যেন সম্মুখ যুদ্ধে না। যায়। তারা এ ধরনের যুদ্ধের জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নয়। এছাড়া তারা উপযুক্ত অস্ত্রেও সজ্জিত নয়। তাদেরকে কেবলমাত্র শত্রুর গতিবিধি লক্ষ্য রাখার কাজে নিয়োগ করবেন। অথবা রেইড এ্যামবুশ এবং ক্ষিপ্রগতিতে শত্রুর ওপর রেইড করার কাজে নিয়োগ করবেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, [ Bangladesh Liberation War ]
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, [ Bangladesh Liberation War ]
আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, যদি গণবাহিনীর ছেলেরা এবং সৈনিকগণ দেশের অভ্যন্তরে তাদের কর্ম তৎপরতা হাসিল করতে পারে তাহলে অতিসত্তর দেশ স্বাধীন হবে। মি. আকবর, সেদিন আর বেশি দূরে নয়। যেদিন আমরা আমাদের ঘৃণ্য শত্রুদেরকে নিপাত করতে ও অন্যায় অবিচারের প্রতিশোধ গ্রহণে সমর্থ হব ইনশাআল্লাহ।’

এ সময় মুজিব বাহিনীর প্রধান তোফায়েল আহমদও আকবর হোসেনের কাছে এক চিঠিতে বলেন, “আকবর ভাই, আপনি দেশের জন্য যে অবদান রেখে যাচ্ছেন তা অতুলনীয়। মুজিব বাহিনীর ছেলেদেরকে আপনার অধীনে রাখবেন এবং আপনাকে থানা প্রধান হিসেবে কাজ করে যাবার জন্য ছেলেদের নির্দেশ দিয়েছি।

আকবর বাহিনীকে সুসংহত করা এবং প্রয়োজন বোধে অস্ত্রশস্ত্রের সহযোগিতার জন্য বিভিন্ন সময়ে বাহিনীপ্রধান হিসেবে আকবর হোসেন মেজর মঞ্জুর, কাপ্টেন হুদা কর্নেল এমএজি ওসমানীর কাছে যেসব চিঠিপত্র পাঠাতেন সেসবের উত্তর আসতে থাকায় তিনি পরিকল্পনা করেন আকবর বাহিনীকে বিস্তৃত করার।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে ফরিদপুর জেলার জামালপুরের হাবিলদার জালাল মিয়াকে (বেঙ্গল রেজিমেন্ট) অস্ত্রসহ তার নিজের এলাকায়, সিরাজ (ইপিআর)-কে কিছু অস্ত্র দিয়ে তার এলাকা নাড়ুয়াতে, রব ও মতিন সাহেবের নেতৃত্বে পাংশায় একটি আঞ্চলিক বাহিনী এবং সোহরাব হোসেনের নেতৃত্বে ডুমাইন এলাকায় একটি করে দল গড়ে তুলতে সহায়তা করেন।

মুক্তিযুদ্ধে আকবর বাহিনীর শহিদ মুক্তিযোদ্ধা :

শহিদ মুকুল, শ্রীপুর, মাগুরা;

শহিদ মো. মোকারকম আলী, শ্রীপুর, শ্রীপুর;

শহিদ আ রাজ্জাক, শ্রীপুর, শ্রীপুর;

শহিদ আ. মতলেব, বীরবিক্রম, শ্রীপুর, শ্রীপুর;

শহিদ আলমগীর, শহিদ রিয়াত আলী, হাজিপুর, শ্রীপুর;

শহিদ আ. ওয়াহেদ;

শহিদ শরিফুল ইসলাম;

শহিদ আলী হোসেন;

শহিদ মতলেব, মাগুরা;

শহিদ আনিসুর রহমান, বিজুপুর;

শহিদ মনিরুজ্জামান;

শহিদ আলিমুজ্জামান;

শহিদ কাওছার হোসেন;

শহিদ মাছিম হোসেন;

শহিদ তাজুল ইসলাম;

শহিদ আ. ছাত্তার, এএফ. শ্রীপুর, মাগুরা;

শহিদ আ. কাদের এফএফ, শ্রীপুর, মাগুরা;

শহিদ আ. মমীন;

শহিদ শহিদুল ইসলাম,

শহিদ ছলেমান,

শহিদ মুন্সি আ. রাজ্জাক, শ্রীপুর, মাগুরা;

শহিদ শেখ মফিজউদ্দিন, মধুখালি, ফরিদপুর;

শহিদ হারেছার মিয়া, শ্রীপুর, মাগুরা:

শহিদ আ. ছালেক;

শহিদ আকবর হোসেন;

শহিদ সেলিম হোসেন;

শহিদ আ. আজিজ;

শহিদ অধীর কুমার, মাগুরা:

শহিদ গুলজার হোসেন;

শহিদ আ. রাশেদ, মাগুরা;

শহিদ হোসেন আলী;

শহিদ গৌর কুমার;

শহিদ নজরুল ইসলাম এফএফ;

শহিদ মোক্তার হোসেন, শ্রীপুর, মাগুরা;

শহিদ হাফিজার রহমান, ইপিআর, মধুখালি, ফরিদপুর;

শহিদ খলিলুর রহমান (সেনাবাহিনী), মধুখালি, ফরিদপুর;

শহিদ নির্মল কুমার বিশ্বাস, মাগুরা;

শহিদ মো. আ. ছাত্তার, মাগুরা;

শহিদ আরিফ মুন্সী, মাগুরা।

সশস্ত্র যুদ্ধে আকবর বাহিনী

মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে অসংখ্যবার একাধিক যুদ্ধে অংশ নিয়েছে আকবর বাহিনী। একাধিকবার শত্রুর ঘাঁটিতে আক্রমণসহ দেশের ভেতরে রাজাকার এবং ডাকাতদের বিরুদ্ধেও তাদের অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এইসব অভিযানের বিস্তারিত বিবরণ আকবর হোসেন তার ‘মুক্তিযুদ্ধে আমি আমার বাহিনী’তে লিপিবদ্ধ করেছেন। মাত্র কয়েকজন সদস্য থেকে শুরু করে পরবর্তীকালে আকাবর বাহিনীর নিয়মিত সদস্যসংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ৬৫০ জনে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, [ Bangladesh Liberation War ]
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, [ Bangladesh Liberation War ]
এদের মধ্যে যেমন দক্ষ পুলিশ, ইপিআর, আনসার, সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিভিন্ন পদমর্যাদার সদস্য তেমনিভাবে সকল পেশার মানুষও ছিল। তারা সবাই সম্মিলিতভাবে নয় মাস যুদ্ধ করে, সহযোগিতা করে, মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে আকবর বাহিনীকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়। আকবর বাহিনীতে সকল মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন তাদের খাওয়া-দাওয়া, পোশাক পরিচ্ছদ, নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ক্যাম্প থেকে সমবণ্টন করা হতো।

ক্যাম্পের তত্ত্বাবধানে কোম্পানি কমান্ডার আব্দুল ওহাব মিয়া, টুপিপাড়া; ওলিয়ার রহমান মৃধা, খামারপাড়া; রাজ্জাক নান্নু, কাশিয়ানী; আবুল হোসেন মিয়া, টুপিপাড়া নিয়োজিত ছিলেন। এছাড়া রান্নার কাজের দায়িত্বে ছিলেন দানেশ মোল্লা, টুপিপাড়া।

মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে দীর্ঘ মাসে আকবর বাহিনী পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসরদের বিরুদ্ধে যেসব যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে, তার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য যুদ্ধের বিবরণ বাহিনীপ্রধান আকবর হোসেনের লেখা ‘মুক্তিযুদ্ধে আমি আমার বাহিনী’ থেকে তুলে হলো:

শ্রীপুর থানায় পাকিস্তানি বাহিনীর ১ম ও ২য় অভিযান

আকবর হোসেন ‘মুক্তিযুদ্ধে আমি আমার বাহিনী’ বইয়ে শ্রীপুর থানায় পাকিস্তানিদের অভিযান সম্পর্কে লিখেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে একপর্যায়ে শহরগুলো পাকিস্তানি বাহিনীর আয়ত্বে এসে যায়। মাঝে মধ্যে মফস্বল এলাকায় প্রবেশ করতে শুরু করেছে। আমরা বরাবরই শ্রীপুর থানায় বাংলাদেশের পতাকা সগর্বে উড়িয়ে রেখেছি। থানার কর্মকর্তা অবশ্য তখনও বাংলাদেশের পতাকা নামাতে সাহসী হননি।

আমার বাহিনীতে কিছু আনসার, ইপিআর, বেঙ্গল রেজিমেন্টের কিছু পলাতক সদস্য এবং স্থানীয় যুবকগণ যোগ দিতে করেছে। এদের নিয়েই শ্রীপুরে একটি ব্যাটালিয়ন গড়ে তুলি। দিন রাত মুক্তিবাহিনীর ট্রেনিং দিচ্ছি। এ সময়ে শ্রীপুর থানার ওসি সম্পূর্ণ বিরুদ্ধ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছিলেন তিনি পাকিস্তানিদের গোড়া সমর্থক। তার প্রচেষ্টায় মাগুরা শহরে কয়েকজন মুসলিম লীগ নেতা পাকিস্তানি মিলিটারিদের তত্ত্বাবধানে শ্রীপুর থানার কয়েকজন ইউপি চেয়ারম্যানসহ প্রভাবশালী বেশ কিছু লোক শান্তি কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

… একাত্তরের ১৫ই মে হঠাৎ পাকিস্তানি বাহিনী শ্রীপুর আসে। ওসি মতিয়ার রহমান আমাদের হাবিলদার শাহজাহান মিয়াকে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধরিয়ে দেয় এবং বলা হয় যে, শাহজাহান মুক্তি বাহিনীর কমান্ডার। পুলিশ ইন্সপেক্টর আব্দুল হাকিমও একথা সমর্থন করায় শাহজাহানকে মাগুরা মিলিটারি ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। শাহজাহান ভাল উর্দু বলতে পারত। সে নিজেকে বিহারী বলে পরিচয় দিলে অনুগ্রহ করে মিলিটারিরা তাকে ছেড়ে দেয়। পরে শাহজাহান আমাদের বাহিনীতে যোগ দেয়।

… ১৯৭১ এর ১৭ই মে মোল্লা নবুয়ত আলী কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে অপারেশনে বের হন। এই সময় তিনি ১জন কুখ্যাত ডাকাত ও ১জন লুটপাটকারীকে দমন করতে সক্ষম হন। এ সময়ে আমরা সারাদিন খালিয়া খড়িচাইলে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ প্রদানের কাজে ব্যস্ত থাকতাম এবং রাতে অন্য কোথাও আত্মগোপন করতাম। পলাতক বাঙালি মিলিটারি, ইপিআর, পুলিশ তখন আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করত। তাদের অনেকেই আমাদের দলে যোগ দেয়।

এ সময় আমার বাহিনীতে ৭০ জন মুক্তিযোদ্ধা এবং ২৪টা রাইফেল ছিল। এ সকল মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে অন্যতম ছিল পূর্ব শ্রীকোলের আনোয়ার হোসেন, সে আমার দলের কমান্ডার ছিল। তাছাড়া নাকোলের ইপিআর আব্দুল আজিজ, কাশিয়ানী থানার মিলিটারি নানু মিয়া (আব্দুল রাজ্জাক), নহাটার ইপিআর মনোয়ার হোসেন, আব্দুল ওহাব, ইপিআর রিজার্ভ পুলিশ সিরাজুল ইসলাম, সুলতান আহমেদ, আব্দুল লতিফ, আবু হাসান এবং আরো অনেকে।

শৈলকুপা থানা দখল

যে সময়ের কথা বলছি তখন কেউ কেউ ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে ফিরে এসেছে। সদ্য ভারত ফেরতা মীনগ্রামের কামরুজ্জামান কিছু সাধারণ অস্ত্র নিয়ে আমার সাথে দেখা করে। কামরুজ্জামান ছিল বিমান বাহিনীর প্রাক্তন সৈনিক। সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে আসা বেলনগরের আলম বেশ আগেই আমার বাহিনীতে যোগ দেয়। সে অত্যন্ত সাহসী ছিল। তার প্ল্যান প্রোগ্রাম অতি চমৎকার।

তিনজন নিরিবিলি বসে অতি দ্রুত একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শৈলকূপা থানা আক্রমণ করতে হবে। জামালপুরের বেঙ্গল রেজিমেন্ট হাবিলদার জালাল উদ্দিন, আব্দুল খালেক, ইপিআর খোকন, মোশাররফ (আর্মি), সিরাজ ইপিআর প্রভৃতি আনন্দের আতিশয্যে লাফিয়ে উঠল।

আর স্নেহানুজ প্রতীম নবুয়ত আলী তো এসব ব্যাপারে সব সময় এক পায়ে খাড়া। যে কথা সেই কাজ। ৫/৮/১৯৭১ তারিখ ৫০টি রাইফেল ও ৩টা চাইনিজ রাইফেল ও বাছা বাছা মুক্তি সেনা নিয়ে রাতে রওয়ানা হলাম শৈলকুপার উদ্দেশ্যে। প্রায় সারারাত হেঁটে ফযর নামাজের আগে দামুকদিয়া পৌঁছালাম।… এখানে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে দেখা হলো। সেই উজির, দবির, বিশারত, আকমল, আলম, মন্টু প্রমুখের কথা আজও আমার স্মৃতিতে চির জাগরূক হয়ে আছে। তাদের কাছে বিশেষ কোনো অস্ত্র ছিল না।

মাত্র ৪/৫টা রাইফেল তাদের সম্বল ছিল…। আকমত নামের একটি ছেলের কাছে এসএমজি দেখা গেল। আর আলমের কাছে দু’ম্যাগজিনসহ একটি চাইনিজ স্টেন।… রাত এগারটার সময় আমরা প্রস্তুত হয়ে গেলাম। দামুকদিয়া স্কুলে একত্র হয়ে লোকজন ভাগাভাগি করে প্ল্যান-প্রোগ্রাম ঠিক করে ফেললাম। বেলনগরের আলমের কমান্ডে বাহিনী পাঠিয়ে দেয়া হলো। রাত দেড়টার সময় শৈলকুপা থানা আক্রমণ করা হয়।

… অনেক সময় গুলি বিনিময় হলো বটে কিন্তু কোনো ফল হলো না।… পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর লুটেরা মাত্র একজন বিহারী সাবরেজিস্ট্রার নিহত হয়। অধিক সুবিধা করতে না পেরে বাহিনী ফিরে এলো। আমি তখন দামুকদিয়া স্কুলে অবস্থান করছিলাম। বাহিনী যখন ফিরে এলো তখন আর বেশী রাত নেই।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, [ Bangladesh Liberation War ]
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, [ Bangladesh Liberation War ]
তাদের পুনরায় থানা আক্রমণের কথা বলে খুব দ্রুত প্রস্তুতি নিয়ে থানার দিকে অগ্রসর হতে লাগলাম। তখন দেখা গেল সাব-রেজিস্ট্রারের লাশ নিয়ে রাজাকার, পুলিশ ও দালালেরা নানারূপ জল্পনা-কল্পনা করছে। আমাদের অতর্কিত আক্রমণে তারা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল। তারা আমাদের সঙ্গে গুলি বিনিময়ের সুযোগ না পেয়ে শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হলো।

এখানে এসময় এগারোজন রাজাকার, পনেরোজন পুলিশ, দুজন দারোগা, একজন সার্কেল অফিসার (রেভিনিউ), শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান মোবারক মোল্লা ও তার সঙ্গীরা ধরা পড়ল। রাইফেল পাওয়া গেল ৫৭টি আর গুলি পাওয়া গেল চার হাজার।… অনেক দিন থেকেই ঐ অঞ্চলে একটা মজবুত বাহিনী গঠন করার ইচ্ছা ছিল আমার। সুতরাং এ সুযোগ মোটামুটি মিলে গেল।

কামরুজ্জামানের নেতৃত্বে উজির, বিশারত, আলম ও মন্টুদের ডেকে আমার ইচ্ছে জানিয়ে ৫০টি রাইফেল তাদের দিয়েছিলাম, মাত্র ৭টি রাইফেল ও ১৫০০ গুলি নিয়ে আমরা ক্যাম্প অভিমুখে রওয়ানা হলাম। পরদিন ভোরবেলা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হলো ‘শৈলকুপা থানা আক্রমণ করে মুক্তিবাহিনী দখল করে নিয়েছে।

শ্রীপুর থানা দখল

শ্রীপুর থানার ওসি মতিয়ার রহমানের সাথে আকবর বাহিনীর একটি চুক্তি ছিল। চুক্তি অনুযায়ী ওসি মতিয়ার রহমান আকবর বাহিনীকে তাদের কাজে বাধা দেবে না। বিনিময়ে আকবর বাহিনীও থানা আক্রমণ না করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু এক সময়ে দেখা যায় ওসি মতিয়ার রহমান তার চুক্তি ভঙ্গ করেছে।

এ সময়ে একদিন শ্রীপুর থানার একজন সিপাইকে মাগুরা যাবার পথে আটক করে তার কাছ থেকে একটি চিঠি উদ্ধার করে আকবর বাহিনীর সদস্য নবুয়ত মোল্লা। এসপি যশোর, পুলিশ ইন্সপেক্টর মাগুরা এবং ব্রিগেডিয়ার সেক্টর হেড কোয়ার্টারকে উদ্দেশ্য করে চিঠিতে লেখা ছিল, ‘চেয়ারম্যান আকবর হোসেন ও মোল্লা নবুয়ত আলীর নেতৃত্বে স্থানীয় একটি দুষ্কৃতিকারী দল গঠিত হয়েছে।

তারা খালিয়া, খড়িচাইল ক্যাম্প করে থাকে। আমাদের শক্তির চাইতে তাদের শক্তি অনেক বেশি। তাদেরকে চতুর্দিক হইতে ঘেরাও করা সম্ভব।’ এই চিঠি উদ্ধারের পরই আকবর বাহিনী ২১/৮/১৯৭১ তারিখ ভোরে শ্রীপুর থানা দখল করে। অভিযানে মুক্তিযোদ্ধা মোল্লা নবুয়ত আলী, নাজায়েত আলী, গোলাম মোস্তফা, আবু হাসান, আবু হোসেন, জহুরুল হক চৌধুরী, আব্দুল খালেক, তোফজ্জেল এর সঙ্গে ভারত থেকে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত কমান্ডার নীরু (টুপিপাড়া) ও তার দল, কমান্ডার মো. এনামুল কবিরের দল এবং কমান্ডার কবির (মাগুরা) অংশগ্রহণ করে। অভিযানের দুই তিন পর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ঘোষিত হয়, শ্রীপুর থানা মুক্ত’।

আলফাপুরের যুদ্ধ

‘হামিদ নামে এক কুখ্যাত ডাকাত আমাদের হাতে খতম হয়। আমাদের দ্বারা শৈলকুপা থানা অপারেশন হবার পর পাকবাহিনীর এক বিরাট দল শৈলকুপা থানা হয়ে শ্রীপুর থানার দিকে অগ্রসর হয়। চারদিকে বর্ষার পানি থৈ থৈ করছিল। নদীতে বিক্ষুব্ধ তরঙ্গমালা। প্রায় জায়গা পানির নিচে। যে কোনো সময় যেকোন দিকে সত্তর যাতায়াত করার জন্যে আমরা কয়েকখানা বাইচের নৌকা সংগ্রহ করেছিলাম।

এদিকে পাকবাহিনীদের সঙ্গে মোকাবেলা করার জন্যে আমরা অগ্রসর হই। পাকিস্তানি মিলিটারিরা আবাইপুর এসে ক্যাম্প করল। আমরা শ্রীকোলে সরাইনগর তাদেরকে প্রটেকশন দেই এবং কামরুজ্জামানরাও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে আলফাপুর প্রটেকশন দেয়। পাকিস্তানি মিলিটারিরা শ্রীকোল দিয়ে অগ্রসর হতে না পেরে নদীর দু’ধার দিয়ে অগ্রসর হতে থাকে। আমাদের বাহিনীর প্রচণ্ড গুলির ঘায়ে মীনগ্রাম মান্দার তলায় বেশ কয়েকজন শত্রুসৈন্য আহত হয় এবং সরাইনগর ওয়াপদা ক্যানেলের ধারে কিছু সংখ্যক মিলিটারি হতাহত হয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, [ Bangladesh Liberation War ]
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, [ Bangladesh Liberation War ]
ইতোমধ্যে আলফাপুর খালের ধারে পাকিস্তানি মিলিটারিরা পৌছার সঙ্গে সঙ্গে কামরুজ্জামানের নেতৃত্বে একটা হামলা পরিচালিত হয়, আর এদিকে স্বাধীনতাকামী মুক্তিসেনারা এপার থেকে ভীষণভাবে গুলি চালাতে থাকে। এ সময় এমনভাবে ক্রসিং ফায়ার হচ্ছিল যে, পাকিস্তানিরা হন্তদন্ত হয়ে পড়ে এবং গুলির আঘাতে তাদের অনেকেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। মৃত পাকিস্তানি সেনাদের সংখ্যা এত বেশি ছিল যে কয়েকদিন ধরে তাদের দুর্গন্ধময় লাশ কুমার নদী দিয়ে ভেসে যেতে থাকে।

ঐদিন সর্বমোট পঞ্চান্ন জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয় এবং কিছু অস্ত্রপাতিও পাওয়া যায়। স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে এ খবর পরিবেশিত হওয়ায় আমাদের মুক্তিসেনাদের সংগ্রামী মনোভাব আরো বেড়ে যায়।

আমাদের বাহিনীর খন্দকার নাজায়েত আলী, মোল্লা নবুয়ত আলী, বদরুল আলম, গোলাম মোস্তফা, আমজাদ আলী, হাফিজার, বাছিরুজ্জামান, অলিয়ার রহমান, আনোয়ার হোসেন, মনোয়ার হোসেন, হাফিজার বাচ্চু, আনারুদ্দীন, মকছেদ, মোক্তাদ, সিরাজ, মতিয়ার, রশিদ, নজর আলী, রুস্তম, ছায়েম, ইন্তাজ, আ. মালেক, হাবিবুর রহমান, আবুবকরসহ অনেক মুক্তিযোদ্ধা এই অভিযানে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেন। এ সময় কামরুজ্জামানের সঙ্গে শৈলকুপার মন্টু মিয়া, আলম ও তাদের সহকর্মীগণ আলফাপুর যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে ভূমিকা পালন করে।’

২য় বার শ্রীপুর থানা দখল

‘হঠাৎ একদিন খবর পেলাম শ্রীপুর পুলিশ স্টেশন নাকোলে স্থানান্তরিত হয়েছে। তখনই নাকোল রওয়ানা হয়ে গেলাম। এসময়ে ভারত থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিসেনা শফিউদ্দিন জোয়াদ্দারের নামে একটা এল.এম.জি ভারত থেকে পাঠানো হয়। এতে আমাদের সংগ্রামী মন আরো সতেজ হয়ে ওঠে। হাফিজ মাস্টারও এসময়ে ভারত থেকে আসেন।

… শেষ পর্যন্ত আমরা যখন একটা এলএমজি পেয়ে গেলাম তখন আমাদের শক্তি অনেক পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। এদিকে এসএলআর ও এসএমজি’র আমাদের কোনো অভাব ছিল না বলে আমরা শত্রু সৈন্যের সর্বপ্রকার প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করার মত শক্তি পেয়ে গেলাম। আমরা সদলবলে নাকোল পৌঁছে ত্রিমুখী আক্রমণের ব্যবস্থা করি। থানার পুলিশগণ পরিস্থিতি ভয়াবহ মনে করে খুব বেশি বাড়াবাড়ি করল না। তবে দুজন পুলিশ ক্যাম্পের দালানের ছাদ থেকে গুলি ছুঁড়তে থাকে।

আমরা এলএমজি’র ব্রাশ ফায়ার দু-তিন বার করা সত্ত্বেও তাদের গুলি ছোঁড়া অব্যাহত থাকে। এরই মাঝে স্বাধীনতা সংগ্রামে উৎসর্গীকৃত প্রাণ মুকুল কোনো এক ফাঁকে উক্ত দালানের পেছন দিয়ে উপরে উঠে গিয়েছে এবং দুজন দুর্ধর্ষ পুলিশকে এমনভাবে জাপটে ধরেছে যে তাদের তখন নতি স্বীকার করা ছাড়া উপায় ছিল না। যাহোক ওখান থেকেও ৪৪টি রাইফেল এবং ১টি রিভলভারসহ বেশ কিছু গুলি পাই। সুতরাং গুলির অভাব আর থাকল না। নাকোল মুক্তির খবর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয়।

রামদিয়ার যুদ্ধ

মুক্তিযুদ্ধে আকবর বাহিনীর শত যোদ্ধার স্মৃতিকথা শীর্ষক সম্পাদনাগ্রন্থে মুক্তিযোদ্ধা মুন্সী গোলাম মোস্তফা তার স্মৃতির জানালা থেকে ‘৭১-এর কথা’ শীর্ষক নিবন্ধে রামদিয়ার যুদ্ধ প্রসঙ্গে লিখেছেন- ‘আমাদের ক্যাম্প ছিল দারইপোল শিহাব উদ্দিন খান সাহেবের বাড়িতে। একদিন অধিনায়ক (আকবর হোসেন) সাহেব আনুমানিক ৭০ জন যোদ্ধা নিয়ে রামদিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন।

যাওয়ার পথে বাহিনী গড়াই নদীর শানবাঁধা ঘাট পার হয়ে সোনাপুর হয়ে রামদিয়া রেলস্টেশনের পাশ দিয়ে চাঁদ খাঁর বাড়ির নিকট পৌঁছায়। তখন প্রায় সকাল ১০ ঘটিকা। চাঁদ খাঁর বাড়িতে ছিল ১৭/১৮ জন বিহারী। খবরটি পৌছায় অধিনায়ক সাহেবের কাছে। বহরপুরের সেনাবাহিনীর হাবিলদার জালাল সাহেব আমাদের যুদ্ধের ব্যাপারে অনেক সহায়তা করেন। যার ফলে আমাদের যুদ্ধে জয়লাভ অনেক সহজ হয়।

আমরা ৪টি রাইফেল উদ্ধার করে আনতে সক্ষম হই। ঐখানে জালাল সাহেব আমাদের হনীতে যোগদান করে বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। ফেরত পথে ইপিআর সিরাজুল ইসলাম নাড়ুয়া এবং পুলিশ বাচ্চু মিয়া, ম্যাকচামি আমাদের বাহিনীতে যোগদান করে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

বিনোদপুর রাজাকার ক্যাম্প আক্রমণ

‘আমাদের নিকটবর্তী আর কোনো শত্রু ক্যাম্প না থাকায় মুহম্মদপুরের হাফিজ মাস্টার সাহেবের সঙ্গে আমাদের পরামর্শ হলো যে, বিনোদপুর রাজাকার ক্যাম্প আক্রমণ করতে হবে। এ ব্যাপারে মুহম্মদপুর থানায় রশিদ বিশ্বাস সাহেব ও নজরুল ইসলাম সাহেবের সাথে যোগাযোগ হয়ে গেল। আমাদের লোক তাদের কাছে পাঠানোর পর তারা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাদের যাবার জন্য খবর পাঠালেন।

৪/১০/১৯৭১ তারিখে একটা এলএমজি আর বেশ কিছু সংখ্যক এসএলআর, এসএমজি এবং রাইফেলসহ বাছাইকৃত ৬৫ জন মুক্তিসেনা রওনা হয়ে যাই।… রাধানগর পৌঁছাতে রাত হয়ে গেল। ঐ রাত ছিল পবিত্র শবেবরাতের রাত। স্থানীয় কর্মী সোহরাব মিয়া আমাদেরকে সেখানে অপেক্ষা করার জন্যে নির্দিষ্ট জায়গা দেখিয়ে দিলে আমরা সেখানেই অপেক্ষা করতে লাগলাম।

এখানে উল্লেখ্য যে, সর্ব জনাব সোহরাব হোসেন, আমিন হোসেন, ইছরাইল হোসেন, রুহুল বিশ্বাস, বদরুজ্জামান (শিক্ষক), আছিরউদ্দিন (শিক্ষক) প্রভৃতি ব্যক্তিগণ আমার বাহিনীর সংগঠনের ব্যাপারে ইতোপূর্বেও আমাদেরকে আর্থিক সহায়তা দান করেন।… আমি আমার মুক্তিসেনাদের প্রস্তুত হতে বললাম।… আমার আদেশ পাওয়া মাত্র আলম, মাকু মিয়া, ফয়েজ, মান্নান, সিরাজ, সাজাহান, মালেক, হারেজ, খালেক, নওশের, মোশাররফ, রকিব, আনোয়ার, হাফিজসহ সবাই তৈরি হয়ে গেল।

ইতোমধ্যেই রেকির তথ্যানুসারে একটা প্ল্যান তৈরি করে ফেলি। পরিকল্পনা অনুযায়ী দল ভাগ করা হয়ে গেল। এলএমজি সেকশানকে একটা ভাগে পজিশন দেয়া হলো। অন্ধকার থেকেই আমাদের মুক্তিসেনারা যথাসময়ে পজিশনে পৌঁছে গেল। রাজাকাররা নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত ছিল। কেউবা গোসল করছিল, কেউবা আরাম করে মেসওয়াক করছিল। এমন সময় হঠাৎ অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে ক্যাম্পের মধ্যে প্রবেশ করল। একজন কমান্ডার সঙ্গে সঙ্গে হুইসেল দিয়ে দিল।

ওরা আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে রাইফেল নিয়ে লাফিয়ে পড়ল। গুলি বিনিময় শুরু হয়ে গেল। রাজাকাররা যখন দৌড়াদৌড়ি করছিল তখন তাদেরকে লক্ষ্য করে আমাদের মুক্তিসেনারা এমনভাবে আঘাত হানছিল যে, আমার মনে হচ্ছিল রাজাকার ক্যাম্পের লোক প্রায় খতম হয়ে গেছে। এলএমজি নিয়ে ওদের মজবুত পজিশন ছিল স্কুল বিল্ডিং-এর উপর। নীচের যে সব এলএমজি ব্যাংকার ছিল তার প্রায় সবগুলোই আমাদের গুলির আঘাতে নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।

ওদের সর্বমোট ৬টি এলএমজি ছিল। প্রায় আড়াই ঘণ্টা যাবৎ গোলাগুলি হবার ফলে দালানের মধ্যে যারা ছিল তারা আত্মসমর্পণ করার জন্য চিৎকার শুরু করে দেয়।

আমাদের প্রথম আক্রমণের ৫ মিনিটের মধ্যে আমাদের প্রিয় মুক্তিসেনা মুকুল শহিদ হয়ে গেল। এই অভাবিতপূর্ণ ঘটনায় আমাদের সবাই ব্যথিত হয়ে ওঠে। বারংবার যখন রাজাকাররা আত্মসমর্পণ করার জন্য হয়ে উঠেছে তখন দেখা গেল আলোকদিয়া থেকে ৫০/৬০ জন রাজাকার দুটি এলএমজি নিয়ে পেছন থেকে আমাদের আক্রমণ করছে।

মাগুরা থেকে পাকিস্তানি সেনারা খবর পেয়ে চাউলিয়া এসে পৌঁছে এবং সেখান থেকে আরআর ২” মর্টার ও এলএমজি নিয়ে ফায়ার করতে শুরু করল। এসময়ে পরিস্থিতি মোকাবেলা না করে মাঠের দিকে বেরিয়ে পড়লাম এবং তখনও দেখা গেল যে অনবরত বিল্ডিং-এর উপরে স্থাপিত এলএমজি সমানভাবে ব্রাশ ফায়ার করে চলেছে। আমাদের লোকেরা যখন দৌড়ে রেঞ্জের বাইরে চলে এল তখন ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও শহিদ মুকুলের লাশ সঙ্গে আনা সম্ভব হলো না।”

মাগুরা বিজয়

‘৪/১২/১৯৭১ তারিখে আমরা খবর পেলাম ক্যাপ্টেন ওহাবের কাছে অয়ারলেস করা হয়েছে যে এক দিনের মধ্যে মাগুরা অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনাদের পজিশনের একটা মানচিত্র তৈরি করে দিতে হবে। আমাদের বাহিনীর রেকি অ. ওহাব জোয়ার্দার ওরফে বাঁশি মিয়াকে পাঠালাম।

যথাসময়ে মিলিটারি পজিশনের ম্যাপ তৈরি হয়ে এল। সঙ্গে সঙ্গে বিশেষ দূতের মাধ্যমে ম্যাপ পাঠিয়ে দেয়া হলো ক্যাপ্টেন আব্দুল ওহাবের কাছে। ম্যাপ অনুযায়ী মিত্র বাহিনী আকাশ পথে মাগুরার ভায়নার অয়ারলেসের পাশে বোমা ফেলে। এই আক্রমণে মাগুরার ২৫০ জন পাকিস্তানি সেনা মারা যায় এবং ৮৭ জন গুরুতর রূপে আহত হয়।

আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার জন্যে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।… ৬/১২/১৯৭১ তারিখে ভোর বেলা খবর পেলাম তিনজন পাকিস্তানি সেনা খালি গায়ে মাত্র একটা অস্ত্র নিয়ে আমাদের শ্রীকোল ইউনিয়নের রামনগর গ্রামের একটা বাড়িতে প্রবেশ করেছে।

আমরা খুব তাড়াতাড়ি সেখানে গিয়ে তাদেরকে ধরে ফেলি এবং একটা জি-৩ রাইফেল তাদের নিকট থেকে উদ্ধার করা হয়।… তিনজন পাকিস্তানি সেনা আমাদের হাতে ধরা পড়ার পর এলাকায় বিপুল আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং খুবই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে সমস্ত এলাকার মুক্তিযোদ্ধারা খামারপাড়া ক্যাম্প গুটিয়ে এলো, অতঃপর আমরা মনস্থ করলাম সত্তর মাগুরা ঢুকতে হবে। সিদ্ধান্ত গৃহীত হবার পর পরই আমরা সবাই মিলে বীরদর্পে মাগুরা রওয়ানা হলাম।

… এ ঐতিহাসিক অভিযানে আমার সহযোগী হয়ে বীরদর্পে চলেছিল:

কোম্পানি কমান্ডার আনারুদ্দিন ইপিআর (পূর্ব শ্রীকোল),

কোম্পানি কমান্ডার আলম এসসি আর্মি (বেলনগর),

কোম্পানি কমান্ডার আব্দুল ওহাব (টুপিপাড়া),

কমান্ডার মাকুমিয়া,

কমান্ডার আব্দুল মান্নান ইপিআর,

কমান্ডার আশরাফউদ্দিন আহমদ ইপিআর,

কমান্ডার আ. আজিজ ইপিআর,

কমান্ডার আব্দুল খালেক (মধপুর),

কমান্ডার মোশারফ (মজা) ইপিআর,

কমান্ডার সিরাজুল ইসলাম ইপিআর (সিগন্যাল),

কমান্ডার আব্দুল রাজ্জাক (নান্নু) আর্মি (কাশিয়ানী),

কমান্ডার মনিরুল ইসলাম (জেন্টাল) আর্মি,

কমান্ডার আব্দুল মালেক আর্মি (আমতৈল),

কমান্ডার মানেয়ার হোসেন (নোহাটা),

আকরাম হোসেন পুলিশ,

কমান্ডার আব্দুল কালাম ইপিআর, (ঘাসিয়াড়া),

কমান্ডার হারেজউদ্দিন খান আনসার (বগুড়া),

কমান্ডার আফজাল হোসেন ইপিআর,

কমান্ডার আব্দুল মান্নান আনসার (রাইনগর),

কমান্ডার মনোয়ার হোসেন ইপিআর (বগুড়া),

কমান্ডার ইদ্রিস আলী (পূর্ব শ্রীকোল),

কমান্ডার ওলিয়ার মৃধা (খামারপাড়া),

কমান্ডার হাফিজার রহমান (বিষ্ণুপুর),

কমান্ডার সুলতান আহম (বিষ্ণুপুর),

কমান্ডার নওশের আলী বেঙ্গল রেজিমেন্ট (দ্বারিয়াপুর),

এফএফ কমান্ডার নুরুল হুদা (পল্টু),

ডেপুটি কমান্ডার সুবীর কুমার (নিজনান্দুয়ালী) এফএফ,

কমান্ডার জহুর-ই-আলম (শেখপাড়া) এফএফ,

কমান্ডার নীরু,

ডেপুটি কমান্ডার নাসিমুজ্জামান (মিনু) (টুপিপাড়া) এফএফ,

কমান্ডার সামছু (গোপালপুর),

মুজিববাহিনী কমান্ডার আ. রহমান (দুতে),

ডেপুটি আতিয়ার রহমান (টুপিপাড়া)

ডেপুটি সিরাজুল ইসলাম (খামারপাড়া) এবং তাদের অধীনস্থ সহস্রাধিক মুক্তিসেনা।

সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন সুলতান,

আ. লতিফ, শহিদুল ইসলা (রাজা),

নজরুল ইসলাম (আসাদ),

আবু বকর,

হাবিবুর,

আ. রশিদ,

রুস্তম আলী,

মোকছেদ আলী,

মোক্তাদের রহমান,

ইলাহী রহমান,

বাবু আলী খাঁ,

শাহাবুদ্দিন খাঁ,

ইরাদুল আক্তার (ফয়েজ),

খোকন,

ইপিআর ইছহাক,

ইপিআর গোলাম মোস্তাফা (বারুইপাড়া),

আবুল হোসেন (পাল্লা),

ইসলা (হরিন্দী),

আব্দুল ওহাব (কাবিলপুর),

আবু হোসেন এবং জহুর,

জাহিদ প্রাক্তন বৈমানিক (বেলনগর)।

বাঁধভাঙ্গা স্রোতের ন্যায় উদ্দাম গতিতে চলছিল মুক্তিসেনারা। আমার সঙ্গে হেঁটে ও দৌড়ে যারা ইতোপূর্বে বরাবরই হার মেনেছে, তাদের কাছে আজ আমি যেন বারবার পরাস্ত হচ্ছি। মোল্লা নবুয়াত আলী, খন্দকার নাজায়েত আলী, হাফিজ মাস্টার, মোল্লা শাহাদৎ আলী, মোল্লা নুরুল হোসেন ইতোমধ্যেই মাগুরার নিকটবর্তী পৌঁছে গেছেন। কেউবা মাগুরাতে ঢুকে পড়েছেন।

এতক্ষণে আমি মাগুরা কাঠের ব্রিজের নিকট এসে পৌঁছে গেছি। সময় তখন ১১টা। আমার হঠাৎ স্মরণ হল যে এখনই হয়তোবা মিত্র বাহিনীর হাওয়াই আক্রমণ শুরু হয়ে যাবে। আমি অতিসত্বর লোক মারফত খবর পাঠালাম মুক্তিযোদ্ধারা যেন এখনই নিজনান্দুয়ালী গ্রামে ফিরে আসে। মুক্তিসেনারা অতি ক্ষিপ্র গতিতে আমার কাছে ফিরে এল।…

পরদিন ভোরে আমরা সবাই মিলে মাগুরা ঢুকে পড়লাম। আমরা শহরে প্রবেশ করার পরপরই শহরের লোকেরা তাদের পরিত্যক্ত ঘর বাড়িতে ফিরে আসতে থাকে। এ সময়ে শহরের সব মানুষকেই কিছুটা সন্ত্রস্ত বলে বোধ হচ্ছিল। আমি পূর্বে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের দায়িত্ব, কর্তব্য সম্পর্কে সজাগ করে দিয়েছিলাম এবং আমার নির্দেশ অনুসারে তারা নিজ নিজ কমান্ডারের নিয়ন্ত্রণাধীন স্ব স্ব পজিশনে অবস্থান নিল…..

পাকিস্তানি সেনারা মাগুরায় মূলত পিটিআই, সিও অফিস এবং কোয়ার্টারে অবস্থান করছিল। এসব জায়গা ছেড়ে যাবার পর আমরা পাকিস্তানিদের পরিত্যক্ত যাবতীয় মালামাল রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব মুক্তিসেনাদের ওপর অর্পণ করি। বিকাল পাঁচটা থেকে মিত্র বাহিনীর সেনারা মাগুরাতে প্রবেশ করতে থাকে। মেজর চক্রবর্তী মাগুরাতে এসেই আমার খোঁজ করেন। কিছুক্ষণ পরে আমার সাথে তার সাক্ষাৎ হল।

… কুশলাদি বিনিময়ের পর তিনি আমাকে বলেন, আগামী কাল সকালে অবশ্যই আসবেন। আমার ট্যাংকে আপনাকে যেতে হবে। আমি সম্মতি জ্ঞাপন করলাম।… পরদিন ভোরে আমি আব্দুল লতিফকে সঙ্গে করে মেজর চক্রবর্তীর অফিসে যেতেই দেখলাম উনি প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন।… অনতিবিলম্বেই আমরা মেজর চক্রবর্তীর ট্যাংকে উঠে পড়লাম।

… আমাদের ট্যাংকটি ছিল পঞ্চম। আমরা ডাইভারশন ক্যানেলে পৌঁছাতে না পৌঁছাতে দেখলাম মিত্র বাহিনীর সব ট্যাংক আশপাশ দিয়ে নেমে গতি বাড়িয়ে দিয়েছে এবং ক্যানেলের মধ্যে নেমে এসেছে।… এগিয়ে দেখলাম ডাইভারশন ক্যানেলের কাঠের ব্রিজটি আগুনে পুড়ছে। পাকিস্তানি সেনারা পালিয়ে যাবার সময় ব্রিজটিকে আগুন ধরিয়ে দিয়ে গেছে যাতে মিত্র বাহিনী পারাপার হতে না পারে। মেজর চক্রবর্তী হ্যাঙ্গিং ব্রিজ তৈরি করার নির্দেশ দিলেন।

… ইতোমধ্যেই ক্যাপ্টেন এটিএম আব্দুল ওহাব তার দলবল নিয়ে মাগুরায় পৌঁছে গেছেন।… মাগুরা প্রবেশ করে… বিকেলের দিকে রাস্তায় লোকের দারুণ ভীড় জমে গেল আমাকে দেখার জন্য। লতিফ, সুলতান, মৌলভী নাজায়েত আলী, হাফিজ মাস্টার, আনারুদ্দিন, মকছেদ সবাই হয়রান হয়ে যচ্ছে। সবাই আমার হিতৈষী, সবাই হাত মিলাতে বুক মিলাতে চাইছে। প্রচণ্ড ভীড় শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা।

এ পরিস্তিতিতে সবাই মিলে আমাকে পাশে পিছিয়ে নিয়ে গেল এবং একটা রিকশার উপর আমাকে দাঁড়াতে অনুরোধ করল।… সবাইকে আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা ও মোবারকবাদ জানিয়ে উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে বললাম এ বিজয় আমাদের সবার। আপনারা আমাদের পাশে না থাকলে আমরা এ বিজয় কেতন ছিনিয়ে আনতে পারতাম না।’

মুক্তিযুদ্ধে আকবর বাহিনীর কমান্ডার আকবর হোসেন এর দাফন
মুক্তিযুদ্ধে আকবর বাহিনীর কমান্ডার আকবর হোসেন এর দাফন

তথ্যসূত্র :

১. অধিনায়কের কথা: আকবর হোসেন, মুক্তিযুদ্ধে আকবর বাহিনী শত যোদ্ধার স্মৃতিকথা; সম্পাদনাঃ জাহিদ রহমান, ঢাকা, তরফদার প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি ২০১৩

২. আকবর হোসেন, মুক্তিযুদ্ধে আমি ও আমার বাহিনী, মাগুরা, খামাড়পাড়া, শ্রীপুর, প্রকাশকালঃ ১৯৯৬; পৃষ্ঠা: ২২

৩. আকবর হোসেন, প্রাগুণ্ড, পৃষ্ঠাঃ ২৬

8. আকবর হোসেন, প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ৯৬

৫. আকবর হোসেন, প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ৯২

মন্তব্য করা বন্ধ রয়েছে।