হাট্টিমাটিম টিম কবিতা – রোকনুজ্জামান খান

হাট্টিমাটিম টিম কবিতা – ‘হাট্টিমাটিম টিম’। তারা মাঠে পাড়ে ডিম, তাদের খাড়া দুটো শিং, তারা হাট্টিমাটিম টিম। এই ছড়াটি জানেন না এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া মুশকিলই বটে। মোটামুটি কথা ফুটলেই বাঙালি শিশুদের যে কয়েকটি ছড়া কণ্ঠস্থ করানো হয়, তার মধ্যে এটি একটি। কিন্তু জানেন কি? এই ছড়াটি মোটেই চার লাইনের নয়। রোকনুজ্জামান খানের লেখা একটি ৫২ লাইনের সম্পূর্ণ ছড়া এটি।

 

হাট্টিমাটিম টিম কবিতা - রোকনুজ্জামান খান
হাট্টিমাটিম টিম কবিতা – রোকনুজ্জামান খান

 

রোকনুজ্জামান খান (জন্মঃ ৯ এপ্রিল, ১৯২৫ – মৃত্যুঃ ৩ ডিসেম্বর, ১৯৯৯) বাংলাদেশের একজন প্রতিষ্ঠিত লেখক ও সংগঠক ছিলেন। কিন্তু তিনি দাদাভাই নামেই সম্যক পরিচিত ছিলেন। তার জন্ম রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলায়। বাংলাদেশের বহুল প্রচারিত দৈনিক ইত্তেফাকের শিশু-কিশোরদের উপযোগী কচিকাঁচার আসর বিভাগের পরিচালক হিসেবে আমৃত্যু দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৪৮ সালে আবুল মনসুর আহমদ সম্পাদিত ইত্তেহাদ পত্রিকার ‘মিতালী মজলিস’ নামীয় শিশু বিভাগের দায়িত্ব লাভের মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে শিশু সওগাত পত্রিকায় দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫২ সালে দৈনিক মিল্লাতের কিশোর দুনিয়া’র শিশু বিভাগের পরিচালক ছিলেন। ১৯৫৫ সালে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় তরুণ সাংবাদিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। ২রা এপ্রিল শিশু-কিশোরদের উপযোগী কচিকাঁচার আসর বিভাগের পরিচালক নিযুক্ত হন এবং আসর পরিচালকের নামকরণ করা হয় দাদাভাই। সেই থেকে তিনি নতুন পরিচয় পান দাদাভাই। তার পরিচিতিতেই ছোটদের উপযোগী করে লিখতেন – সুফিয়া কামাল, আব্দুল্লাহ আল মুতি শরফুদ্দিন, শওকত ওসমান, আহসান হাবীব, ফয়েজ আহমেদ, হোসনে আরা, নাসির আলী, হাবীবুর রহমানসহ বিখ্যাত অনেক লেখক।

 

হাট্টিমাটিম টিম কবিতা – রোকনুজ্জামান খান

 

রোকনুজ্জামান খান গুরুকুল লাইভ লিউজ হাট্টিমাটিম টিম কবিতা - রোকনুজ্জামান খান

 

টাট্টুকে আজ আনতে দিলাম
বাজার থেকে শিম
মনের ভুলে আনল কিনে
মস্ত একটা ডিম।

বলল এটা ফ্রি পেয়েছে
নেয়নি কোনো দাম
ফুটলে বাঘের ছা বেরোবে
করবে ঘরের কাম।

সন্ধ্যা সকাল যখন দেখো
দিচ্ছে ডিমে তা
ডিম ফুটে আজ বের হয়েছে
লম্বা দুটো পা।

উল্টে দিয়ে পানির কলস
উল্টে দিয়ে হাঁড়ি
আজব দু`পা বেড়ায় ঘুরে
গাঁয়ের যত বাড়ি।

সপ্তা বাদে ডিমের থেকে
বের হলো দুই হাত
কুপি জ্বালায় দিনের শেষে
যখন নামে রাত।

উঠোন ঝাড়ে বাসন মাজে
করে ঘরের কাম
দেখলে সবাই রেগে মরে
বলে এবার থাম।

চোখ না থাকায় এ দুর্গতি
ডিমের কি দোষ ভাই
উঠোন ঝেড়ে ময়লা ধুলায়
ঘর করে বোঝাই।

বাসন মেজে সামলে রাখে
ময়লা ফেলার ভাঁড়ে
কাণ্ড দেখে টাট্টু বাড়ি
নিজের মাথায় মারে।

শিঙের দেখা মিলল ডিমে
মাস খানিকের মাঝে
কেমনতর ডিম তা নিয়ে
বসলো বিচার সাঁঝে।

গাঁয়ের মোড়ল পান চিবিয়ে
বলল বিচার শেষ
এই গাঁয়ে ডিম আর রবে না
তবেই হবে বেশ।

মনের দুখে ঘর ছেড়ে ডিম
চলল একা হেঁটে
গাছের সাথে ধাক্কা খেয়ে
ডিম গেলো হায় ফেটে।

গাঁয়ের মানুষ একসাথে সব;
সবাই ভয়ে হিম
ডিম ফেটে যা বের হলো তা
হাট্টিমাটিম টিম।

হাট্টিমাটিম টিম
তারা মাঠে পারে ডিম
তাদের খাড়া দুটো শিং
তারা হাট্টিমাটিম টিম।

হাট্টিমাটিম টিম কবিতা এর ইতিহাসঃ

হাট্টিমা টিম্ টিম্ একটি লোকায়ত ছড়া। অনেক কাল ধরে সাধারণ মানুষের মাঝে প্রচলিত হয়ে আছে। কে রচনা করেছেন তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। ১৮৯৯ সালে ভারতের কোলকাতার সিটি বুক সোসাইটি প্রকাশিত “খুকুমণির ছড়া” বইয়ের ১৩ তম সংষ্করণের ৩৭ নাম্বার পৃষ্ঠায় “হাট্টিমাটিম টিম” ছড়াটি পাওয়া যায়। যেটা যোগীন্দ্রনাথ সরকারের সংকলিত একটা বই। কলকাতার প্রকাশনা সংস্থা ‘শিশু সাহিত্য সংসদ’ ১৯৫০ সালে ছোটোদের জন্য ‘ছড়ার ছবি’ নামে রঙিন ছবি সমন্বিত একটি ছড়ার বই প্রকাশ করেন। এই বইয়ের মধ্যে ‘হাট্টিমা টিম্ টিম্’ নামক কাল্পনিক প্রাণীটিকে নিয়ে চার লাইনের ছড়াটি সংকলিত হয়।

আবার ১৯৫২ সালে প্রকাশিত নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘ছোটদের শ্রেষ্ঠ গল্প’ বইয়ের ‘দুর্ধর্ষ মোটর সাইকেল’ শিরোনামের গল্পে ‘হাট্টিমাটিম টিম, তারা মাঠে পারে ডিম’ লাইন দুটি গল্পের একটি প্রধান চরিত্র প্যালারাম-এর ভাষ্যে ব্যবহার করেছিলেন নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়।

বইটির ছড়াগুলি সংকলন করেন শ্রী মহেন্দ্রনাথ দত্ত। বইটি প্রকাশনার পর হাট্টিমা টিম টিম নামক কাল্পনিক প্রাণীটি ছোটোদের মধ্যে খুবই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এরপরে, ১৯৭৪ সালে তৎকালীন দ্যা গ্রামোফোন কোম্পানী অব ইন্ডিয়া’ (বর্তমানে ‘সারেগামা’) ছয়টি ছড়াকে গানের রূপ দিয়ে একটি রেকর্ড প্রকাশ করেন[৩] (রেকর্ড নম্বর: 7LPE 110)। এই রেকর্ডে হাট্টিমা টিম টিম ছড়াটিরও গীতিরূপ অন্তর্ভুক্ত হয়।

 

রোকনুজ্জামান খান 1 গুরুকুল লাইভ লিউজ হাট্টিমাটিম টিম কবিতা - রোকনুজ্জামান খান

 

 

হাট্টিমাটিম টিম কবিতা আবৃত্তিঃ