আফ্রিকা কবিতা – বর্তমানে আলোচ্য কবিতাটি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচনা করেছিলেন ১৩৪৩ বঙ্গাব্দে। তৎকালীন সময়ে এটি একটি পত্রিকায় প্রকাশিত হলেও, পরে ‘পত্রপুট’ কাব্যগ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণে এটি সংকলিত হয়। পরবর্তী সময়ে এটি বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘সঞ্চয়িতা’ –তে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (৭ মে ১৮৬১ – ৭ আগস্ট ১৯৪১; ২৫ বৈশাখ ১২৬৮ – ২২ শ্রাবণ ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ) ছিলেন অগ্রণী বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, সংগীতস্রষ্টা, নাট্যকার, চিত্রকর, ছোটগল্পকার, প্রাবন্ধিক, অভিনেতা, কণ্ঠশিল্পী ও দার্শনিক। তাকে বাংলা ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক মনে করা হয়। রবীন্দ্রনাথকে “গুরুদেব”, “কবিগুরু” ও “বিশ্বকবি” অভিধায় ভূষিত করা হয়। রবীন্দ্রনাথের ৫২টি কাব্যগ্রন্থ, ৩৮টি নাটক, ১৩টি উপন্যাস ও ৩৬টি প্রবন্ধ ও অন্যান্য গদ্যসংকলনতার জীবদ্দশায় বা মৃত্যুর অব্যবহিত পরে প্রকাশিত হয়। তার সর্বমোট ৯৫টি ছোটগল্প ও ১৯১৫টি গান যথাক্রমে গল্পগুচ্ছ ও গীতবিতান সংকলনের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় প্রকাশিত ও গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত রচনা ৩২ খণ্ডে রবীন্দ্র রচনাবলী নামে প্রকাশিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় পত্রসাহিত্য উনিশ খণ্ডে চিঠিপত্র ও চারটি পৃথক গ্রন্থে প্রকাশিত। এছাড়া তিনি প্রায় দুই হাজার ছবি এঁকেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের রচনা বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ১৯১৩ সালে গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদের জন্য তিনি এশীয়দের মধ্যে সাহিত্যে প্রথম নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
Table of Contents
আফ্রিকা কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
উদ্ভ্রান্ত সেই আদিম যুগে
স্রষ্টা যখন নিজের প্রতি অসন্তোষে
নতুন সৃষ্টিকে বারবার করছিলেন বিধ্বস্ত,
তাঁর সেই অধৈর্যে ঘন-ঘন মাথা-নাড়ার দিনে
রুদ্র সমুদ্রের বাহু
প্রাচী ধরিত্রীর বুকের থেকে
ছিনিয়ে নিয়ে গেল তোমাকে, আফ্রিকা,
বাঁধলে তোমাকে বনস্পতির নিবিড় পাহারায়
কৃপণ আলোর অন্তঃপুরে।
সেখানে নিভৃত অবকাশে তুমি
সংগ্রহ করছিলে দুর্গমের রহস্য,
চিনছিলে জলস্থল-আকাশের দুর্বোধ সংকেত,
প্রকৃতির দৃষ্টি-অতীত জাদু
মন্ত্র জাগাচ্ছিল তোমার চেতনাতীত মনে।
বিদ্রূপ করছিলে ভীষণকে
বিরূপের ছদ্মবেশে,
শঙ্কাকে চাচ্ছিলে হার মানাতে
আপনাকে উগ্র করে বিভীষিকার প্রচণ্ড মহিমায়
তাণ্ডবের দুন্দুভিনিনাদে।

আফ্রিকা কবিতা সারাংশ:
সভ্যতার সেই আদিমযুগে বিশ্বের প্রাচ্য ভূভাগ থেকে আফ্রিকা নানা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে, অন্ধকার গভীর অরণ্যানীতে সে সমাচ্ছন্ন হয়। সেখানকার দুর্গম তমসাময় প্রকৃতির দৃষ্টি-অতীত জাদু সমস্ত শঙ্কাকে হার মানাতে চাইছিল। ছায়াবৃতা আফ্রিকার মানবরূপ বাইরের পৃথিবীর উপেক্ষায় অবজ্ঞায় অজ্ঞাত থেকে গেছে। এমনই সময় (ইউরােপের) সভ্যতাভিমানী বর্বর নেকড়ের দল নির্লজ্জভাবে আফ্রিকাকে শৃঙ্খলিত করবার জন্য এগিয়ে এল।
ফলে দস্যুদের আক্রমণে বীভৎস অত্যাচারে রক্তে-অশুতে মিশে গেল আফ্রিকার মানবতা। ওদিকে (ইউরােপের) পাড়ায় পাড়ায় চলল উৎসব সমারােহ।আজ সেই পশ্চিমাকাশে সেই পশু শক্তিই আবার নতুন করে যখন বেরিয়ে এসেছে, তখন মানহারা এই মানবীর (আফ্রিকার) পাশে দাঁড়িয়ে হিংস্র প্রলাপের মধ্যেও মানবতাবাদী কবি ক্ষমার আহ্বান জানাচ্ছেন। এটিই হােক সভ্যতার শেষ বাণী।

আফ্রিকা কবিতা এর ইতিহাস ঃ
পত্রপুট (১৯৩৬) কাব্য-এ ষােলাে সংখ্যক কবিতা – ‘উদ্ভান্ত সেই আদিম যুগে’ (নাম আফ্রিকা) কবি অমিয় চক্রবর্তী লিখে পাঠাবার জন্য অনুরােধ করায় ২৮ শে মাঘ ১৩৪৩, ইং ১২ ফ্রেব্রুয়ারি ১৯৩৬ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই কবিতাটি রচনা করেন। কবিতাটি প্রথমে প্রবাসী (চৈত্র ১৩৪৩) ও পরে কবিতাটির পত্রপুটের দ্বিতীয় সংস্করণে (১৩৪৫) প্রকাশিত হয়। ৩রা অক্টোবর, ১৯৩৫ ফ্যাসিস্ত মুসােলিনির নির্দেশে ইতালীয় আক্রমণকারী সৈন্যদল অ্যাবিসিনিয়ায় (ইথিওপিয়া) আক্রমণ করে।
রবীন্দ্রনাথ এখানে তার প্রতিবাদ করে আফ্রিকা, ‘ছায়াচ্ছন্ন আফ্রিকার সকল বন লাঞ্ছনার রক্তাক্ত ইতিহাসকে স্মরণ করে এক অনবদ্য কাব্য রূপ দিয়েছেন। বেদনায় ভারাক্রান্ত চিত্তে একান্ত মমতায় এক লাঞ্ছিত কৃয়া মানবীর রূপ এই কবিতায় তিনি নির্মাণ করেছেন। আবেদন রেখেছেন “দাঁড়াও ঐ মান-হারা মানবীর দ্বারে।”

আফ্রিকা কবিতা আবৃত্তি ঃ